খুদে ফুল চাষী দেলোয়ার এখন কোটিপতি

0
79

যে কোন সোনালী সম্ভাবনাময় কিংবা অপার উদ্ভাবনাময় কাজ শুরু করার মাহিন্দ্রক্ষণে আসে অনেক বাঁধা বিপত্তি। নিজের খেয়ে নিজের পরে শুনতে হয় নিন্দুকের অযাচিত কথা। যা শুনলে কিছু কিছু সময় এক মুহুর্তের মধ্যেই লৌহ ইস্পাতের মত মনটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। বিজলির মত আচমকা হতাশার ঢেউ বুকের মাঝে বয়ে যায়। আবার এসব কথা বাধা বিপত্তি সমুদ্রের উত্তাল জোয়ারের ঢেউয়ের মত ধাক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে যারা সামনের দিকে নৌজোয়ানের মত এগিয়ে যায়। তারাই নানা কাজে সফলতা পায়।

ফুল ভালবাসে না এ রকম কোনো একটা লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ কথা যেমন চিরন্তন সত্য। তেমনি আবার ফুলের জন্য পাগল, ফুলের প্রেমে দেওয়ানা পৃথিবীর বুকে এ রকম লোকের সন্ধান পাওয়াও এক বিরল ঘটনা। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পূর্ব খন্ড গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে মো: দেলোয়ার হোসেন। পরের কথা গায়ে না মেখে প্রবল মনবল আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে সফলতার ইতিহাস তৈরি করেছেন।

২০০৪ সালে অদম্য সাহসী দেলোয়ার ক্ষুদ্র পরিসরে বাবার কাছ থেকে জমানো ৪ হাজার টাকা নিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে কিনে আনেন কিছু ফুলের চারা। পরিবারের সবাই অবাক হয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশিসহ সবাই তাকে পাগল বলা শুরু করল। বাবার বকুনি উপেক্ষা করে নিরাশ না হয়ে দেলোয়ার তার লক্ষ্যের দিকে এগোতে লাগলেন। কারণ ৪ হাজার টাকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুনে ফেলেছেন তার স্বপ্নের বীজ। নিজের শ্রম, অধ্যবসায় ও মেধার সমন্বয়ে এগিয়ে চলা দেলোয়ারকে সফলতা ধরা দিয়েছে এক যুগেই। এক যুগ আগে ৪ হাজার টাকার পুঁজি, আজ দাঁড়িয়েছে কোটি টাকার ওপরে। বর্তমানে প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে ফুল বাগান রয়েছে দেলোয়ারের। ২০১৭ সালের কৃষিতে সর্বোচ্চ ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার’ পেয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে ১৪ জুলাই ক্রেস্ট ও ২৫ হাজার টাকা তুলে দেন।

পড়ালেখার গন্ডি মাধ্যমিক না পেরোতেই কৃষিতে আতœনিয়োগ করেন তিনি। শুরুতে স্বল্প পরিসরে নিজের কৃষি জমিতে দেশীয় গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা ফুর্লের চাষ শুরু করে উৎপাদিত ফুল ঢাকার শাহবাগে বাজারজাত শুরু করেন। সন্তোষজনক মূল্য আর ক্রমেই ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি তাকে ফুল চাষে আরও উদ্যোগী করে তোলে। শুরু হয় নতুন নতুন ফুল চাষের প্রচেষ্টা।

ফুল নিয়ে এখানেই তার কৌতহল কিংবা বিশ্ব ফুলের বাজার সম্পর্কে জানার আগ্রহ শেষ না। সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমতে সে আরও এক ধাপ এগিয়ে চলে আসছে। এবার গাজীপুরের উচ্চ শিক্ষিত পন্ডিত ব্যাক্তিত্ব, যারা আন্তর্জাতিক তথ্য সম্পর্কে জানেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাইলেন বিশ্বের ফুল উৎপাদনকারী সেরা দেশটির নাম। জ্ঞান পন্ডিতরাও তাকে জানান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফুল উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে নেদারল্যান্ড।

এ দেশটি বিশ্বের বায়ান্ন শতাংশ ফুলের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। ফুল উৎপাদনের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীর দরিদ্র দেশ হিসেব পরিচিত কেনিয়া, ইকুয়েডর সহ আফ্রিকা দেশগুলোতে ইজরাইলি বিজ্ঞানীদের সহযোগীতায় ফুল চাষে সহজে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশের দেশ ভারতেও ব্যাপক হারে ফুল চাষ করা হয়। দেলোয়ার হল্যান্ড এর একজন ফুল চাষীর সঙ্গেও ফুল চাষ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তার পরামর্শে ২০০৫ সালে চায়না যার্বেরা ফুলের চাষ করার সিদ্ধান্ত নেন।

শুরুতে পাশের দেশ ভারত থেকে কিছু চারা এনে চাষ শুরু করেন। বাংলাদেশের আবহাওয়া এ ফুলের জন্য অনুক‚লে না থাকায় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত শেড তৈরি করে তার ভেতরে চাষাবাদ শুরু হয়। প্রথম থেকেই ভালো ফলন পেলেন তিনি। কিছুদিন পর জার্বেরার সঙ্গে চায়না বড় জাতের গোলাপ চাষ শুরু করেন। ২০১২ সালের দিকে তিনটি বড় খামারে ১৮ বিঘা জমিতে বিশাল পরিসরে শুরু করেন জার্বেরা ও গোলাপ চাষ। ফুল চাষের বিভিন্ন কলাকৌশল আয়ত্ত করতে তিনি বেশ কয়েকবার বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছেন। চীনের একটি ফুল বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও যোগ দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, জার্বেরা ফুলের একটি চারা থেকে টানা ৩ বছর ফুল পাওয়া যায়। একটি গাছ থেকে ৩ বছরে প্রায় ১০০ ফুল উৎপাদিত হয়, যার প্রতিটির বাজার মূল্য ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বর্তমানে তার বাগানে ২২০০ জার্বেরা ফুল উৎপাদনক্ষম চারা রয়েছে। সঙ্গে চায়না বড় জাতের গোলাপের চারা রয়েছে প্রায় ১০ হাজার। সব মিলিয়ে তার বাগান থেকে বছর অন্তত ১৮ লাখ টাকা আয় হয়।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিতে এগিয়ে যাওয়া দেখে দেলোয়ারের স্বপ্ন আরও জেঁকে বসেছে। এবার তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন মডেল নার্সারি গড়ে তোলার। যেখানে কৃষিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভ‚মিকা রাখতে চান। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষককে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকলেও বাংলাদেশে তা নিতান্তই কম। এখনও কৃষিক্ষেত্রে নান ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে বলে জানান। কৃষির স্বপ্নদ্রষ্টা দেলোয়ারের খামারে বর্তমানে ৪ নারী ও ১৩ পুরুষ সার্বক্ষণিক যোগযোগ রক্ষা করেন।

ইংরেজী সাহিত্যে ¯œাতকোত্তর শিউলী আক্তার লেখাপড়া শেষ করে দেলোয়ারের কৃষি খামারের ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেছেন ৫ বছর হলো। উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ শেষে কৃষি খামারে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথম প্রথম বন্ধু-বান্ধবীরা তাকে কটুক্তি করলেও ভালো বেতনে তিনি তার কাজ নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। কৃষি খামারে কাজ করে যে নিজের ক্যারিয়ার গড়া যায় এটাই তার প্রমাণ।

জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর দেলোয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করবেন চিন্তাও করতে পারেননি। একজন কৃষক হিসেবে জাতীয় পুরস্কারের মধ্য দিয়ে তার কর্মস্পৃহা ও দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। প্রথম প্রথম সবাই তাকে পাগল অভিহিত করলেও এখন সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। এটাই তার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মুয়িদুল হাসান বলেন, দেলোয়ার একজন সফল ফুল চাষি। ফুল চাষই তাকে এনে দিয়েছে কৃষিতে সর্বোচ্চ বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক। তাকে কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগীতা প্রদান করা হয়ে থাকে।

লেখক: এম এস রুকন