দূরন্ত লড়াই করেও ইংল্যান্ডের কাছে কলম্বিয়ার হার

0
70

টাইব্রেকার ছিল ইংল্যান্ডের জন্য চিরকালের এক দুঃখগাথা। এর আগে তিনবার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের ভাগ্য-পরীক্ষায় নেমে প্রতিবারই হতাশার পোস্টার হতে হয়েছে ব্রিটিশদের। অবশেষে দুর্ভাগ্যের সেই জাল ছিঁড়ে টাইব্রেকারে শেষ হাসি হাসল ইংল্যান্ড।

মঙ্গলবার মস্কোর স্পার্তাক স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর অগ্নিগর্ভ ম্যাচে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে এক যুগ পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল ইংল্যান্ড। হ্যারি কেনের পেনাল্টি গোলে নির্ধারিত সময়েই জয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ইংলিশরা।

তবে ইনজুরি টাইমে ইয়েরি মিনার গোলে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় কলম্বিয়া। সেখানেও ১-১ সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ডের বীরত্বে ভাগ্য-পরীক্ষায় এবার শেষ হাসি হাসে থ্রি লায়নরা।

টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের পক্ষে হ্যারি কেন, রাশফোর্ড, ট্রিপিয়ার ও এরিক ডায়ার লক্ষ্যভেদ করেন। হেন্ডারসনের নেয়া তৃতীয় শট রুখে দিয়ে কলম্বিয়াকে আশার আলো দেখিয়েছিলেন গোলকিপার ডেভিড অসপিনা।

তবে দলকে ডুবিয়ে দেন উরিবে ও বাক্কা। কলম্বিয়ার পক্ষে প্রথম তিন শটে ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করেছিলেন ফ্যালকাও, কুয়াদরাদো ও মুরিয়েল। উরিবের নেয়া চতুর্থ শট পোস্টে প্রতিহত হয়। এরপর বাক্কার শেষ শট ঠেকিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডকে উৎসবের উপলক্ষ এনে দেন পিকফোর্ড।

আগামী ৭ জুন সামারায় কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। কাল শেষ ষোলোর আরেক ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে সুইডেন।

ইংল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচটি কাল আক্ষরিখ অর্থে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল। বারবার হাতাহাতিতে জড়িয়ে হলুদ কার্ড দেখেছেন দু’দলের সাত খেলোয়াড়। প্রথমার্ধে ম্যাচের প্রথম সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেনি ইংল্যান্ড। কিরেন ট্রিপিয়ারের ক্রসে কঠিন কোণ থেকে হেড লক্ষ্যে রাখতে পারেননি হ্যারি কেন।

আক্রমণে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও প্রথমার্ধে গোল করার তেমন ভালো সুযোগ আসেনি। বরং মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে রেষারেষি। এমনই এক ঘটনায় জর্ডান হেন্ডারসনকে মাথা দিয়ে হালকা গুঁতো মেরে হলুদ কার্ড দেখেই পার পেয়ে যান কলম্বিয়ার উইলমার বারিওস।

দ্বিতীয়ার্ধেও চলে দু’দলের খেলোয়াড়দের ধাক্কাধাক্কি। ৫৪ মিনিটে কেনের ওপর পেছন থেকে অযথা চড়াও হয়ে ইংল্যান্ডকে পেনাল্টি উপহার দেন কার্লোস সানচেজ, দেখেন হলুদ কার্ড। স্পটকিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় টুর্নামেন্টে নিজের ষষ্ঠ গোলটি করেন আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা কেন।

পাল্টা আক্রমণে ৮১ মিনিটে কলম্বিয়াকে সমতায় ফেরানোর একটি সুযোগ পেয়েছিলেন হুয়ান কুয়াদরাদো। কিন্তু ডি-বক্সে ফাঁকায় বল পেয়েও শট লক্ষ্যে রাখতে পারেননি জুভেন্টাস মিডফিল্ডার। ইংল্যান্ডের জয় যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, তখনই ঘুরে দাঁড়ায় কলম্বিয়া। ইনজুরি টাইমে আসে সমতা ফেরানো গোল।

মাতেয়াস উরিবের জোরালো শট দারুণ নৈপুণ্যে কর্নারের বিনিময়ে সেভ করেছিলেন ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড। ওই কর্নার থেকেই লাফিয়ে ওঠা দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডার ইয়েরি মিনার লক্ষ্যভেদী হেড নবজীবন দেয় কলম্বিয়াকে।

গোললাইনে থাকা জেমি ভার্ডি বলে মাথা লাগিয়েও ফেরাতে পারেননি। বার্সেলোনা তারকা মিনা এবারের আসরে এ নিয়ে তিনটি গোল করলেন। সব কটিই এসেছে হেডে। মিনার এই গোলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু শেষে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হল কলম্বিয়াকে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়ার পর আর কখনোই শেষ ষোলো পেরোতে পারেনি সুইডেন। মাঝে ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে তো খেলাই হয়নি তাদের। এবার এক যুগ পর বিশ্বকাপে ফিরেই সবাইকে চমকে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল সুইডিশরা।

মঙ্গলবার সেন্ট পিটার্সবার্গে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে সুইডেন। দ্বিতীয় রাউন্ডের সবচেয়ে ম্যাড়মেড়ে ম্যাচে ৬৬ মিনিটে এমিল ফোর্সবার্গের ভাগ্যপ্রসূত গোল সুইজারল্যান্ডের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর পর সুইডেনকে তুলে দিল শেষ আটে।

গতবারও শেষ ষোলো থেকে শূন্যহাতে ফিরতে হয়েছিল সুইসদের। সেবার তাদের ঘাতক ছিল আর্জেন্টিনা। সুইডেন-সুইজারল্যান্ড ম্যাচটিকে অনেকে চিত্রিত করেছিলেন দুই মধ্যবিত্তের লড়াই হিসেবে। যাদের ঠিক ফেলেও দেয়া যায় না, আবার যাদের ঘিরে বড় স্বপ্নও দেখা যায় না।

সুইডেনের বিশ্বকাপ ফাইনালে (১৯৫৮) খেলার ইতিহাস থাকলেও বর্তমান দলটিতে সেই অর্থে বড় কোনো তারকা নেই। তবে ‘দশে মিলে করি কাজ’ নীতির সফল বাস্তবায়নে গ্রুপসেরা হয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রাখে সুইডিশরা। অন্যদিকে গ্রুপসেরা হতে না পারলেও প্রথম রাউন্ডে অপরাজিত ছিল সুইজারল্যান্ড। প্রথম ম্যাচে তারা রুখে দিয়েছিল ব্রাজিলকে।

বিশ্বকাপে টিকে থাকতে একাদশে কাল চারটি পরিবর্তন আনেন সুইস কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ। গোলশূন্য প্রথমার্ধে বল পজেশনে এগিয়েছিলেন শাকিরি-জাকারাই। ৬৬ শতাংশ সময় বল ছিল সুইজারল্যান্ডের দখলে।

এ সময় সুইজারল্যান্ডের ৩০৫টি পাসের বিপরীতে সুইডেনের পাস ছিল মাত্র ১৫২টি। কিন্তু আক্রমণে সুইডেনই ছিল এগিয়ে। সুইজারল্যান্ডের যে দুটি শট লক্ষ্যে ছিল, তার কোনোটিই বিপজ্জনক নয়।

অন্যদিকে সুইডেন মাত্র একটি শট লক্ষ্যে রাখতে পারলেও বারবার ভীতি ছড়িয়েছে সুইসদের রক্ষণে। শুরুতেই দারুণ দুটি সুযোগ নষ্ট করেন সুইডিশ ফরোয়ার্ড মার্কাস বার্গ।

এরপর ৪২ মিনিটে মিকায়েল লাসতিগের ক্রস গোলমুখে পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে শট লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন আলবিন একদাল। দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধারা অব্যাহত রাখে সুইডেন। ৪৯ মিনিটে আরেকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন অলা তইভনেন।

তবে সুইডেনের আক্রমণের ঢেউয়ের মুখে সুইজ্যারল্যান্ডের প্রতিরোধের দেয়াল একসময় ভেঙে পড়ে। ৬৬ মিনিটে কিছুটা ভাগ্যের ছোঁয়ায় এগিয়ে যায় সুইডেন। তইভননের পাস থেকে এমিল ফোর্সবার্গের বুলেট গতির শট সুইস ডিফেন্ডার ম্যানুয়েল আকানজির পায়ে লেগে কিছুটা দিক পাল্টে গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়িয়ে যায়।

গোলটি ফোর্সবার্গের নামের পাশে জমা হলেও কার্যত এটি আত্মঘাতী গোলই। গোল হজমের পর সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ফিরতে মরিয়া চেষ্টা করলেও সুইডেনের গোলমুখ খুলতে পারেননি শাকিরিরা। গোলকিপার রবিন ওলসেনের দারুণ দুটি সেভের পাশাপাশি সুইডিশ ডিফেন্ডাররাও অসাধারণ কিছু ব্লক করেছেন।

ইনজুরি টাইমে সুইস ফরোয়ার্ড হারিস সেফেরোভিচের গোলার মতো হেড ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন ওলসেন। এরপর চকিত প্রতিআক্রমণে সুইজারল্যান্ডের অরক্ষিত রক্ষণসীমায় ঢুকে পড়েছিলেন মার্টিন ওলসন। বক্সের ঠিক বাইরে তাকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন মিখায়েল লাং।

রেফারি শুরুতে পেনাল্টির বাঁশি বাজালেও ভিএআর রিভিউয়ে সেটি পাল্টে যায় ফ্রিকিকে। শেষ মুহূর্তে ডি-বক্সের মুখ থেকে সুইডেনের ফ্রিকিক সুইস গোলকিপার ইয়ান সমার ঠেকিয়ে দিলেও তাতে শেষরক্ষা হয়নি সুইজারল্যান্ডের।

১-০ গোলের লড়াকু জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেল ১৯৫৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপ সুইডেন। শেষ বাঁশি বাজতেই গ্যালারিতে শুরু হয়ে যায় হলুদ উৎসব। গত এক যুগের সবচেয়ে বড় তারকা জ্লাটান ইব্রাহিমোভিচকে ছাড়াই বিশ্বকাপে ফেরাটা এভাবে রাঙাবে সুইডেন তা কে ভেবেছিল!