নগরায়ন: গাজীপুরের হাসি-কান্না

0
142

নূর মোহাম্মদ:

কি নেই এখানে, গাঁয়ের মেঠো পথ থেকে শুরু করে দৃষ্টিকাড়া সজ্জিত মহাসড়ক, লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের অসংখ্য পোশাক কারখানা কিংবা দেশের একমাত্র হাইটেক পার্ক; অস্ত্রাগার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি টাকার একমাত্র ছাপাখানাও এখানেই।

রয়েছে দেশের একমাত্র জাতীয় আর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। তাইতো অপার সম্ভাবনাময় জেলাগুলোর শীর্ষে গাজীপুর। যেটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে কালোত্তীর্ণ মহিমায় আর বর্ণিল দীপ্তিতে ভাস্বর।

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে এই গাজীপুরের জয়দেবপুরেই সংঘটিত হয় প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ, যেই বীরত্বগাঁথা স্মৃতি ধারণ করে বীর দর্পে দাঁড়িয়ে আছে জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্য। সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে দেশব্যাপী বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর অর্জিত হয় লাল-সবুজের পতাকা, যেটি আমাদের গর্বের আত্মপরিচয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই ঘুরে দাঁড়াতে থাকে গাজীপুর। রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নগরায়নের ছোঁয়া লাগতে থাকে এখানে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য জেলার চেয়ে গাজীপুর কোন অংশেই পিছিয়ে পড়েনি।

সময়ের পরিক্রমায় নগরায়ন বাড়তে থাকে আর কর্মের সন্ধানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকামুখী হয় মানুষ। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার আধিক্যে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় এক কোলাহলপূর্ণ নগরীতে, অনেকটা বসবাসের অযোগ্যও হতে থাকে রাজধানী। ফলে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েকগুন। আর এই তালিকায় সর্বাগ্রে গাজীপুরই সবার পছন্দ।

ঠিক হয়েছেও তাই। বিনিয়োগকারীরা এখানেই স্থাপন করছেন অসংখ্য বহুতল কলকারখানা কিংবা ব্যবসায়িক উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। ফলে কর্মের সন্ধানে এখন বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়তই অসংখ্য কর্মজীবী মানুষ যুক্ত হচ্ছেন এই জেলায়। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনেই তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প।

একইসঙ্গে বাড়ছে স্কুল-কলেজ কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও। রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি আধুনিক রিসোর্ট, যেখানে একটু বিনোদন আর প্রকৃতির মেলবন্ধন খোঁজেন রাজধানী কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণ পীপাসুরা। তাইতো অবস্থানগত কারণে ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে গাজীপুর এক আলোর আধার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

নগরায়নের ছোঁয়া এতোটাই লেগেছে যে, গাজীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন বড় বড় অসংখ্য কারখানা। এতে মূল্যমাণ বাড়ছে জমির। অনেকেই ঢাকার পার্শ্ববর্তী এই জেলায় এক টুকরো জমি কেনার স্বপ্ন বুনে চলেছেন হৃদয়ে। আর এসবের কারণে ইতোমধ্যেই পরিবর্তন হতে শুরু করেছে সামাজিক অবস্থারও।

কিন্তু এসব ইতিবাচক দিকের উল্টো পীঠে রয়েছে কষ্ট আর বেদনার নানা উপাখ্যান। যা গাজীপুরকে করছে ক্ষতবিক্ষত, ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয়দের। একইসঙ্গে হারাতে বসেছে ঐতিহ্যের গ্রামীণ পরিবেশ আর দৃষ্টিকাড়া সবুজের মাঠ-ঘাট।

নগরায়ন হচ্ছে এমন এলাকার নদী, খাল ও ডোবার পানি আজ আর পানি নেই, যেন কালো রং মেশানো পঁচা-দুর্গন্ধের জলাধার। আর এসবের জন্য দায়ী অধিকাংশ শিল্পকারখানা। যারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই রাসায়নিক মিশ্রিত অপরিশোধিত বর্জ্র সরাসরি ছেড়ে দিচ্ছে খাল কিংবা নালায়।

ফলে বিষাক্ত এই পানি চলে যাচ্ছে কৃষি জমিতে, কমছে উর্বরতা। রাসায়নিক মিশ্রিত এই পনিতে ধান কিংবা অন্য কোনো ফসলই হচ্ছে না। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প-কারখানার পার্শ্ববর্তী কৃষি।

শুধু তাই নয়, কৃষিজমি দখলদারিত্বেও চরম খেলা চলছে এখন গাজীপুরে। অভিযোগ রয়েছে, বড় বড় গ্রæপ আর ক্ষমতাধররা সাধারণ বাসিন্দাদের কাছ থেকে জমি দখল করে নিচ্ছে নামমাত্র দামে। অনেক জায়গায় নানা ফন্দিফিকির করে একরকম বাধ্যই করা হচ্ছে জমি বিক্রি করতে।

এসবের অধিকাংশই কৃষি জমি, যেসব জমিতে ইতোমধ্যেই শোভা পাচ্ছে অসংখ্য কোম্পানিক সাইনবোর্ড। অথচ, সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, কৃষিজমি নষ্ট করে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কারখানা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেটি হলো- বেড়েছে সামাজিক অসহিষ্ণুতা। এর প্রধান কারণ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সম্মিলন। কারণ, একেক এলাকার মানুষের জীবনাচরণ ও ব্যক্তিত্ব ভিন্নরূপ।

একজনের চোখে যেটা ভালো, অন্যজন সেটিকে গ্রহণ করছেন ভিন্নভাবে, হচ্ছে মতানৈক্য। পরকীয়া কিংবা প্রেম ঘটিত বিষয়তো রয়েছেই। ফলে নিত্যদিনই বাড়ছে খুন কিংবা আত্মহত্যার ঘটনা। বন-জঙ্গল আর বাসা-বাড়ি থেকেও উদ্ধার হচ্ছে মৃতদেহ। যে সংখ্যার পারদ গত কয়েক দশকের মধ্যে এখন ঊর্ধ্বমুখি।

এতোসব নিরাশার মাঝেও আশার বাতি জ্বলজ্বল করছে, উন্মুক্ত হচ্ছে সম্ভাবনার দার। ইতোমধ্যেই গাজীপুরের একটি বড় অংশ আওতায় এসেছে সিটি কর্পোরেশনের। পুলিশও মেট্রোপলিটন হওয়ার পথে। শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রামেও শিল্প কারখানা হওয়ায় মূল্যমাণ বাড়ছে জমির, ইতোমধ্যেই ঘর ভাড়া দেয়ার প্রচলন শুরু হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। একইসঙ্গে বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদায় উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা, অনেকটা রাজধানীর ঢাকার মতোই; যা বিগত দিনে চিন্তাও করেননি তারা।

শেষতক বলা যায়, অভাবনীয় উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে গাজীপুর। তবে এ সমৃদ্ধিকে স্থায়ী ও কল্যাণকর দিকে নিয়ে যেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে হতে হবে আরও যত্মবান। নীতি ভাঙার রেওয়াজ থেকে বের করে অসাধু ব্যক্তিদের বাধ্য করতে হবে নিয়মের। তবেই সবুজের এই জনপদের কৃষক হবে লাভবান, অর্থনৈতিকভাবে আরও উন্নত হবে দেশ; রক্ষা পাবে গাজীপুরের স্বকীয় ঐতিহ্য।