নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলা বিচারের শুনানি শুরু; বেরিয়ে এলো লোমহর্ষক পরিকল্পনার তথ্য

0
1069

২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ৫১ জনের প্রাণহানি ঘটে। মসজিদে নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ব্রেন্টন টেরেন্ট নামের এক শেতাঙ্গ ব্যক্তি।

হামলার সময় আবেগের কোনও ছিটেফোঁটাতো ছিলই না বরং পুরো ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিম চালু করে দেখানো হয়। বর্বর ওই হামলার ভিডিও ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। সরাসরি এভাবে হামলার ভিডিও আগে দেখেনি কেউ।

নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ওই হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী টেরেন্ট। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আদালতে সোমবার থেকে শুনানি শুরু হয়েছে। শুনানি চলবে চারদিন।

শুনানির সময় আদালতে বিচারপতির সামনে এই অস্ট্রেলীয় ‘দানবের’ আরও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার বিস্তারিত জানান ক্রাউন প্রসিকিউটর বার্নাবি হাউয়েস।

ভারী অস্ত্রসজ্জিত ট্যারান্টের এলোপাতাড়ি গুলি থেকে সেদিন রেহাই পায়নি পুরুষ থেকে শুরু করে মহিলা-শিশু কেউই। কেউ বাঁচার আকুতি জানালেও তাকে গুলি করেন এবং এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে যাওয়ার সময় একজন আহত ব্যক্তির উপর দিয়ে গাড়ি চালান। এতটাই নির্মম ছিলেন ট্যারান্ট। 

তিন বছরের এক শিশুকে তার বাবার পা শক্ত করে ধরে থাকতে দেখে তাকেও গুলি করেন ট্যারান্ট। শুধু তাই নয়, আরও বেশি মানুষকে গুলি করতে চেয়েছিলেন ওই শ্বেতাঙ্গ বন্দুকধারী। বছর খানেক ধরে এই নির্মম হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।

তার হামলার লক্ষ্যস্থল ছিল দুটি নয়, তিনটি মসজিদ- আল নূর, লিনউড ও অ্যাশবার্টন। কিন্তু প্রথম দুটি মসজিদে হামলা চালানোর পর অ্যাশবার্টন মসজিদে যাওয়ার পথে আটক করা হয় তাকে।

২৯ বছর বয়সী এই হামলাকারীর বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় ক্রাইস্টচার্চের আদালতে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছান ট্যারান্ট এবং বসবাস করতে থাকেন ক্রাইস্টচার্চের ৩৬০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর ডুনেডিনে। ওখানেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকেন এবং ৭ হাজার রাউন্ডের বেশি গুলি কেনেন। এছাড়া সামরিক ধাঁচের ব্যালিস্টিক অস্ত্র ও ভেস্টও কিনেছিলেন।

হামলার দুই মাস আগে ট্যারান্ট ক্রাইস্টচার্চে যান এবং আল নূর মসজিদের উপর দিয়ে একটি ড্রোন উড়িয়ে এর চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। মসজিদটির গঠন, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং দুটি মসজিদের মধ্যে যাওয়া আসার কৌশলও তৈরি করেন ড্রোনে তোলা ছবির মাধ্যমে।

ডুনেডিনের বাসা ছেড়ে দিয়ে ১৫ মার্চ শুক্রবার গাড়িতে করে ক্রাইস্টচার্চে যান ভারী অস্ত্রে সুসজ্জিত ট্যারান্ট। বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক যুদ্ধ, ক্রুসেডের সংখ্যা, সাম্প্রতিক সময়ের সন্ত্রাসী হামলা ও প্রতীকের উল্লেখ ছিল তার বন্দুকে। ভেস্টের সামনের পকেটে ছিল গুলির সাতটি ম্যাগাজিন এবং বেয়োনেটের মতো দেখতে ছুরি। পুরোদস্তুর প্রস্তুতি নিয়ে ওই হত্যাযজ্ঞ চালান ট্যারান্ট, যা গোটা বিশ্ব দেখেছে তার হেলমেটে লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে। এছাড়া তার গাড়িতে ছিল পেট্রোলের কন্টেইনার, যা দিয়ে মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বিচারক ক্যামেরন ম্যান্ডারের বেঞ্চে ট্যারান্টের বিচারকাজ চলছে। করোনার কারণে নিউজিল্যান্ডে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সে কারণে সরাসরি এই শুনানিতে কারো উপস্থিতি নেই। বরং অন্য একটি কোর্টরুম থেকে ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে শুনানি প্রক্রিয়া দেখানো হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শুনানির সময় কারাগারের ধূসর পোশাকে দেখা গেছে ব্রেন্টন টেরেন্টকে। সে সময় তার আশেপাশে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। শুনানির সময় একেবারেই নিশ্চুপ ছিলেন এই হামলাকারী।

টেরেন্টকে যাবজ্জীবন কারাভোগ করতে হতে পারে। সম্ভবত প্যারোলে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা থাকছে না তার। নিউজিল্যান্ডে এর আগে এ ধরনের শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি। দেশে প্রথমবারের মতো প্যারোল ছাড়াই কাউকে আজীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন আদালত।