‘প্যাকেজ’ দাপটে হারিয়ে গেছে থ্রিজির গতি, ঠকছেন গ্রাহক

0
118

থ্রি জিদেশে থ্রিজি সেবা চালুর শুরুতে বিভিন্ন প্যাকেজে ইন্টারনেটের গতি (ব্যান্ডউইথ বা সক্ষমতা) উল্লেখ থাকলেও এখন তা আর থাকে না। মোবাইল ফোন অপারেটররা বর্তমানে ইন্টারনেট (ডাটা) বিক্রির সময় গতিও উল্লেখ করে না। ‘ইন্টারনেট প্যাকেজ’ নিয়ে তাই গ্রাহক কেবল ভলিউমই কিনছেন। এই ভলিউম আর প্যাকেজের দাপটে হারিয়ে গেছে ইন্টারনেটের গতি। ফলে থ্রিজির নামে মোবাইল ফোন অপারেটররা যা দিচ্ছে, গ্রাহককে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, থ্রিজি ও টুজি প্রযুক্তির ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্র নির্ধারণে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। ফলে দেশে প্রকৃত অর্থে কতজন থ্রিজি ব্যবহার করে তারও সঠিক কোনও পরিসংখ্যানও নেই। তবে দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে সংজ্ঞা ও গতির উল্লেখ রয়েছে।

‘জাতীয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নীতিমালা- ২০০৯’ এ ব্রডব্যান্ডের গতি (প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত) উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে দু’বার তা পরিবর্তন করে ন্যূনতম ৫ এমবিপিএস করা হয়। কিন্তু থ্রিজির জন্য এ ধরনের কোনও গতি নির্ধারণ করা হয়নি। সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানিয়েছেন ফোরজি’র গতি হবে ২০ এমবিপিএস।

বিটিআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিজেকে উদ্ধৃত না করে বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটররা থ্রিজি চালুর কিছুদিন পর পর্যন্ত ইন্টারনেট প্যাকেজে গতি (সক্ষমতা) প্রকাশ করলেও অনেকদিন ধরেই তা আর করছে না। পরে তারা ইন্টারনেট প্যাকেজ বিক্রি শুরু করে। থ্রিজি এবং টুজি প্যাকেজ পৃথক করতে ‘কথিত জটিলতা’ হওয়ায় অপারেটররা এমন করেছে। পরবর্তীতে কমিশন থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়, প্যাকেজে গতি উল্লেখ করলে অবশ্যই গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’

ওই কর্মকর্তা জানান, ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এমন ছিল যে, ধরা যাক একজন ব্যবহারকারী থ্রিজির একটি প্যাকেজ কিনেছেন। ওই প্যাকেজ ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারী ২জি নেটওয়ার্ক কাভারেজ এলাকায় চলে যান। ফলে ওই সময় গ্রাহকের টুজি (কম গতির ইন্টারনেট) ডাটা চার্জ হওয়ার কথা। কিন্তু তা যদি না হয় এবং ওই সময় থ্রিজির ডাটাই চার্জ হয় তাহলে গ্রাহককে মোট ব্যবহার হওয়া ডাটার ৪০ শতাংশ ফেরত দিতে হবে।

তিনি আরও জানান, মূলত এসবের কারণে মোবাইল ফোন অপারেটররা ইন্টারনেট প্যাকেজ বিক্রি করে, গতি উল্লেখ করে না। এর মধ্যে দিয়ে মূলত গ্রাহককেই ঠকানো হচ্ছে।

বিটিআরসির ওই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে একজন গ্রাহক ইন্টারনেট (ডাটা) কেনার সময় মূলত ভলিউম কিনে থাকেন। এই ভলিউম হলো ডাটার পরিমাণ। তাতে মেয়াদ উল্লেখ থাকলেও গতি উল্লেখ থাকে না। গ্রাহক সপ্তাহ বা মাসের মেয়াদ যে ডাটা কিনে থাকেন তা হলো জিবি (গিগাবাইট), এটা হলো মোট ডাটা। এতে জিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) তথা গতি উল্লেখ থাকে না। এসব ফাঁক-ফোকর গলে অপারেটররা ইন্টারনেট বিক্রি করছে গ্রাহকের কাছে। ফলে থ্রিজি ব্যবহার করে গ্রাহক গতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও কিছুই করতে পারেন না।

জানা যায়, গ্রাহককে থ্রিজির দামে টুজি ইন্টারনেট কেনার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যানের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করতে বলা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, থ্রিজি এবং টুজির প্রযুক্তি পৃথক ও গতি আলাদা হওয়ায় দামের মধ্যেও পার্থক্য থাকতে হবে কিন্তু তা না করে একই দাম রাখা হয়। কমিশনের সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ তদন্তের পরে একই বছরের সেপ্টেম্বরে ইন্টারনেট প্যাকেজের বিষয়ে একাধিক নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে নির্দশনাগুলো কার্যকরও করতে বলা হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়, গ্রাহক থ্রিজি ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে কাভারেজ এলাকার বাইরে গেলে যদি টুজি নেটওয়ার্ক পায়, তাহলে ওই গ্রাহক টুজি নেটওয়ার্কে যে পরিমাণ ডাটা ব্যবহার করবেন তার ৪০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটর ফেরত দেবে।

পাশাপাশি গ্রাহক থ্রিজি নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে থ্রিজি প্যাকেজ কিনতে চাইলে তাকে আগে এসএমএস দিয়ে জানাতে হবে গ্রাহক এখন ওই নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছেন। আর টুজি বা থ্রিজি যেকোনও প্যাকেজের ক্ষেত্রে যে গতি উল্লেখ থাকবে সেটিই গ্রাহককে দিতে হবে।

জানা গেছে, এসব নির্দেশনা জারির পর মোবাইল ফোন অপারেটররা এসব নির্দেশনা পালনে কী কী সমস্যা হতে পারে তা বিশ্লেষণ করে চিঠি দেয়। ইন্টারনেট প্যাকেজে গতি উল্লেখ না করে তা ‘ইন্টারনেট প্যাকেজ’ হিসেবে বিক্রি করা হতে থাকে। ফলে এক হয়ে যায় থ্রিজি ও টুজি সেবা।

মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টি আই এম নূরুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বর্তমানে ইন্টারনেট ডাটার ওপর প্যাকেজ হয়। গ্রাহকরা ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে থাকেন। ফলে সবই এখন থ্রিজি। এখন ‘ইন্ডিভিজুয়াল’ কোনও গ্রাহক যদি এই ক্ষতির (টুজি কাভারেজ এলাকায় গিয়ে ডাটা শেষ হয়ে যাওয়া) সম্মুখীন হন তাহলে তা বের করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ বেশ কঠিন।

৪০ শতাংশ ডাটা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে অ্যামটব মহাসচিব সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “এতদিনে এই নির্দেশনা ‘ভ্যালিড’ থাকার কথা নয়। সেই সময় আমরা আমাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ কমিশনকে জানিয়েছি। তাছাড়া সবাই তো এখন ইন্টারনেট প্যাকেজ বিক্রি করছে। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে গ্রাহককে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব।’

অ্যামটব মহাসচিব জানান, তরঙ্গের স্বল্পতা, নেট নিরপেক্ষতা না থাকা, সিগন্যাল দুর্বল হওয়া এবং সক্ষমতার তুলনায় গ্রাহক সংখ্যা বেশি হওয়ায় গ্রাহককে পুরোপুরি গতি দেওয়া যাচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে নেটওয়ার্ক কাভারেজ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।