বিউটি হত্যার দায় স্বীকার করেছে বিউটির বাবা

0
78

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত বিউটি আক্তার হত্যার ঘটনায় খুনের দায় স্বীকার করেছে বিউটির বাবা। ময়না মিয়ার প্ররোচনায় তিনি এমন হত্যাকান্ড ঘটাতে উদ্বুদ্ধ হন বলে জানিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে স্ত্রী আছমা আক্তারের পরাজয়ে বাবুলের মায়ের বিরূদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছিলেন ময়না মিয়া।

শনিবার হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি হত্যা মামলার বাদী ও বিউটির বাবা ছায়েদ আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে এসব কথা জানান। শনিবার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা।

বিউটির বাবা ছায়েদ আলীর জবানবন্দি উদ্ধৃত করে শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা একথা জানান। এর আগে বিউটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বাদী ছায়েদ আলী শনিবার আদালতে জবানবন্দি দেন।

পাঁচ ঘণ্টা ধরে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বিউটিকে নানার বাড়ি থেকে নিয়ে এসে কীভাবে খুনিদের হাতে তুলে দিয়েছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জবানবন্দির পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।

শনিবার বিকালে নিজ কার্যালয়ে ওই ব্রিফিংয়ে সুপার বলেন, স্বাধীনতার মাসে লাল সবুজের পতাকায় বিউটির হত্যা নিয়ে যে পোস্টটি সারাদেশে ভাইরাল হয়েছে তদন্তে তার বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি উদ্ধৃত করে পুলিশ সুপার বলেন, বিউটির ধর্ষণকারী বাবুল মিয়া অলিপুরে প্রাণ কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসাবে চাকরি করেন। তার মা ইউপি সদস্য হওয়ায় এলাকায় তার অর্থ এবং প্রভাব রয়েছে।

ছায়েদ আলী ছায়েদ আলী বাবুলকে দুশ্চরিত্রের আখ্যা দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, এর আগে তিনি এক প্রবাসীর স্ত্রীকে বিয়ে করেন। পরে বিউটির ওপর তার দৃষ্টি পড়ে। তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ের প্রলোভন দেখান বাবুল। পরে অলিপুর এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত সেখানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করেন তারা।
“৯ ফেব্রুয়ারি বিউটিকে প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সেখানে নিয়ে গেলে খবরটি জানতে পারেন পাশের আরএফএল ফ্যাক্টরিতে চাকরি করা বিউটির মা হুসনা বেগম। তিনি এবং ছায়েদ সেখানে গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন।”

বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় সালিশের মাধ্যমে নিস্পত্তির চেষ্টা করা হলে বিউটিকে বিয়ে করতে বাবুল অস্বীকৃতি জানায় বলে জানান পুলিশ সুপার।

তিনি বলেন, পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অপহরণসহ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন বিউটির বাবা ছায়েদ। মামলাটি গত ৪ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নথিভুক্ত এবং ১২ মার্চ বিউটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আদালতে জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

“বাবুল বিয়ে করলে মামলা তুলে নিবে বলেও বিউটি জবানবন্দিতে জানায়।”

পরে বিউটিকে লাখাই উপজেলার গুণিপুর গ্রামে নানা বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, এই সুযোগে ফন্দি আঁটেন ইউপি নির্বাচনে বাবুলের মায়ের কাছে হেরে যাওয়া আসমা আক্তারের স্বামী ময়না মিয়া।

গত ইউপি নির্বাচনে ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে নির্বাচন করে বাবুলের মা কলম চান বিবির কাছে আওয়ামী লীগ নেতা ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার হেরে যান বলে জানান পুলিশ সুপার।

এরপর থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ চলে আসছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, এরই জেরে বিউটিকে অপহরণের পর ধর্ষণের ঘটনায় মামলায় সাক্ষী হন ময়না। প্রায়ই ছায়েদকে বোঝাতে থাকেন, বাবুল বিয়ে না করলে বিউটিকে কেউ বিয়ে করবে না। তার অন্য সন্তানদেরও বিয়ে হবে না।
“এর চেয়ে বিউটিকে মেরে বাবুল ও তার মাকে ফাঁসানোও হলো এবং প্রতিশোধও নেওয়া হবে।”

এক পর্যায়ে ময়নার ফাঁদে ছায়েদ পা দেন উল্লেখ করে পুলিশ কর্মকর্তা বিধান ত্রিপুরা বলেন, পরে ১০ হাজার টাকায় পেশাদার খুনি ভাড়া করে এবং তাকে আড়াই হাজার টাকা অগ্রীম দেন ময়না।

“ঘটনার দিন রাতে ছায়েদ, ময়না ও ভাড়াটে খুনি গুণিপুর গ্রামে গিয়ে বিউটিকে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে আসে। পরে লাখাই উপজেলার হরিণাকোন গ্রামে ভাড়াটে লোক বিউটির হাত পা বেঁধে রাখে এবং ময়না ছুরি দিয়ে পাঁচটি আঘাত করে হত্যার পর লাশ হাওরে ফেলে রাখা হয়।”

ঘটনা শুনে ১৭ মার্চ বিউটির নানি ফাতেমা বেগম তাদের বাড়িতে এলে মুখবন্ধ রাখার জন্য শাসানো হয় বলে জানান তিনি।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, মেয়ে হত্যার পর একজন বাবার যে অনুভূতি থাকার কথা ছিল ছায়েদের তা ছিল না। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তার এবং ময়নার গুণিপুর গ্রামে উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়ায় ৫ এপ্রিল ময়নাকে এবং পরদিন ছায়েদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

“ভাড়াটে লোককে ধরতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তার করার পর অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচার শুরু করা যাবে।”

বাবুল মিয়া সরাসরি হত্যায় জড়িত না থাকলেও তার কারণেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকে প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে মামলার অভিযোগপত্রে রাখা হবে।
এর আগে শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত হবিগঞ্জ বিচারিক হাকিম তৌহিদুল ইসলামের আদালতে জবানবন্দি দেন ছায়েদ আলী।পরে ময়নার স্ত্রী আসমা আক্তারের বক্তব্যও রেকর্ড করে আদালত।

আর শুক্রবার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে অন্যদের নাম জানান ময়না।

ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তারকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তারকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে তাছাড়া বিউটির নানি ফাতেমা বেগম সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার রাতে একই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বাবুল। তিনি বিউটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন।
এদিকে বাবুলের মা কলম চান বিবিকে দুইদিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার রাতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর বিউটির মা হুসনে আরা ও ভাই সাদেক মিয়া রয়েছেন পুলিশের হেফাজতে।

গত ১৭ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জের হাওরে বিউটির লাশ পাওয়া যায়। এসময় তার শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পায় পুলিশ। পরে এ ঘটনায় ১৮ মার্চ বিউটির বাবা সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল ও তার মাকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর পুলিশ কলম চানকে ও বাবুলের বন্ধু ইসমাইল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। হত্যকাণ্ড এবং হাওরে বিউটির রক্তাক্ত লাশের ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশব্যাপী আলোচনা শুরু হয়। পরে গত ৩০ মার্চ সিলেট থেকে বাবুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

প্রথম দফায় তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান শায়েস্তাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মানিকুল ইসলাম।