মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, স্বাগত ১৪২৫

0
55

১৪২৪ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আজ শনিবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন বছর। জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যম ও সম্ভাবনার নতুন বছরে পা রাখলো বাঙালি জাতি। সব গ্লানি ঝেড়ে ভালো কিছুর প্রত্যাশায় নতুন বছরকে বরণ করে নেবে আবালবৃদ্ধবনিতা।

নতুন বছর মানেই রঙিন হয়ে ওঠার হাতছানি, নতুন আশায় পথচলা। তাই পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশ। এবারও বর্ণিল উৎসবে মাতামাতি হবে। রাজধানী জুড়ে থাকবে বর্ষবরণের নানান আয়োজন। উৎসব আমেজে মুখর হবে চারদিক। পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায় উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে বিভিন্ন আয়োজনে দেখা যাবে সব বয়সীদের প্রাণচাঞ্চল্য। নব আনন্দে জাগবে গোটা জাতি।

বর্ষবরণের নানান অনুষ্ঠান আর আয়োজন দূর করবে সমাজের সব অসঙ্গতি। শান্তি আর সম্প্রীতির বন্ধনে দৃঢ় হবে মানুষের সম্পর্ক। বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে বাঙালি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেবে আনন্দ।

বাংলা নববর্ষ উদযাপন এখন পরিণত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসবে। এটাই আমাদের প্রধান সামাজিক উৎসব। ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে আজ সবার এক হওয়ার মিলনোৎসব। নববর্ষের দিনে উৎসবের আনন্দে শামিল হতে বেরিয়ে পড়ে সব বয়সী মানুষ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানমালা।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
১৯৮৯ সাল থেকে পয়লা বৈশাখের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। বৈশাখী উৎসবে দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজন এটাই। এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় গ্রামীণ জীবন ও আবহমান বাংলাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে সকালে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। তারপর আবারও চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয় এটি। এতে সব শ্রেণিপেশার বিভিন্ন বয়সী মানুষ দলে দলে যোগ দেন। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রঙবেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি।

ছায়ানটের বর্ষবরণ
দেশ স্বাধীনের আগে ১৯৬৫ সালে বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করে ছায়ানট প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ দিয়ে শুরু হয় বৈশাখকে স্বাগত জানানোর পালা। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলা সংস্কৃতি চর্চা বন্ধে কবিগুরুর গান ও কবিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

পরবর্তী সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বৈশাখ বরণের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকে ছায়ানট। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে শুরু হয় তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

নববর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান ধরা হয়ে থাকে ছায়ানটের আয়োজন। গানে ও সুরে নববর্ষের নতুন সূর্যকে আহ্বান জানায় সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। এবারও পয়লা বৈশাখে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিতভাবে সংগীত পরিবেশন করে নতুন বছরকে স্বাগত জানান ছায়ানটের শিল্পীরা। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলে তাদের সঙ্গে শামিল হয় হাজারও শ্রোতা।

হাজার বছরের বাংলা ঐতিহ্যের ধারক এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে এবারও সবশ্রেণির মানুষ বরণ করে নেবেন নতুনকে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় সব অমঙ্গলকে বিদায় জানিয়ে স্বাগত জানানো হবে সুন্দরকে।

বৈশাখী আয়োজন
বর্ষবরণ উপলক্ষে থাকে বাঙালি সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গ। বিনোদনকেন্দ্রগুলোও সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। পহেলা বৈশাখে গানে-বাদ্যে আর উৎসব আমেজে মেতে ওঠা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। এর ধারাবাহিকতায় বাংলা পুরাতন বর্ষবিদায় ও নতুন বর্ষ ১৪২৫ বরণ করতে দেশব্যাপী রয়েছে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নানান আয়োজন।

বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নানান অনুষঙ্গের মধ্যে বর্ষবরণে আজ রাজধানীসহ দেশজুড়ে থাকছে লোকজ অনুষ্ঠান, বাংলা গান, নাচ, আবৃত্তি, কবিগান, নাটক, বৈশাখী মেলা, ঐতিহ্যবাহী বলি খেলা, রাখি উৎসব, ঢাক উৎসব, বৈশাখী উৎসব, কাবাডি, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, পুতুল নাচ, হরগৌড়ি নাচ, বাইদান নাচের পালা, সাপের খেলা, ঘুড়ি উৎসব, নাগরদোলা, নৃত্য, জাদু, ঘোড়ার গাড়ি, পাপেট, গীতিনাট্য, মুখোশে ঢাকা কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন লোক-সাংস্কৃতিক ও উপজাতীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বৈশাখী মেলায় বিক্রি হবে মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, রঙিন বেলুন, ঢোল, ডুগডুগি, পুতুল, মুখোশ, ফিতা, পুঁতির মালা, কাচের চুড়িসহ রকমারি পণ্য-সামগ্রী।

পান্তা-ইলিশ, সাদা-লাল
পহেলা বৈশাখে খাবারের পসরায় ও পোশাকে দেখা যায় বাঙালিয়ানা। দিনের শুরুতে পান্তা-ইলিশ, এরপর ছেলেরা নানান রঙের পাঞ্জাবি আর লাল পাড়ের শাড়িতে মেয়েদের সাজগোজ বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ। বৈশাখ উপলক্ষে হোটেল-রেস্তোঁরায় পরিবেশন করা হচ্ছে বিভিন্ন পদের বাঙালি খাবার। মেলাগুলোতে থাকবে পিঠা উৎসব, পান্তা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কি, খৈ, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজন।

 

যেভাবে এলো পহেলা বৈশাখ
পহেলা বৈশাখ প্রথমে চালু হয় মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে (১৫৫৬-১৬০৯)। তখন কৃষি উৎপাদনের ওপরেই নির্ভরশীল ছিল অর্থনীতি। বাংলায় কৃষি অর্থনীতি আবর্তিত হতো ছয় মাসের ভিত্তিতে।

মুঘল শাসনামলে কৃষকদের খাজনা দিতে হতো হিজরি দিনপঞ্জি অনুযায়ী। কিন্তু ফসল উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে তা ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ। কারণ খাজনা আদায়ের সময় প্রজাদের থাকতে হতো ফসলের অপেক্ষায়। এ কারণে খাজনা পরিশোধ করতে সমস্যার সম্মুখীন হতো দুই পক্ষই। এর সমাধান খুঁজতে নিজের রাজসভার পন্ডিতদের দায়িত্ব দেন সম্রাট আকবর। এর প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন ফতেউল্লাহ সিরাজী।

এরপর কৃষি অর্থনীতির ছয় মাসের আবর্তনকে মাথায় রেখে তৈরি হয় নতুন দিনপঞ্জি। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে ও পহেলা বৈশাখের আগে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের উৎসবের কথা উত্থাপন করেন আকবরের রাজসভার কয়েকজন পন্ডিত। সেই থেকে এই উদ্যোগ খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে উদযাপন হয়ে আসছিল। ওই উৎসবে চৈত্র মাসের শেষ দিন ছিল খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে বর্ষবিদায় ও পহেলা বৈশাখ ছিল ঘরে নতুন ফসল তোলার মাধ্যমে বর্ষবরণ।

পূর্ব পাকিস্তানে দিনটি উদযাপন করা হতো বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে। ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় উৎসব হিসেবে বাংলাদেশে উদযাপন হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ।

বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। ওই হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৪ এপ্রিল অথবা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যে কোনও পঞ্জিকাতেই এদিক দিয়ে মিল চোখে পড়ে ।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুযায়ী নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন। এছাড়া পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির দিন।