স্ট্রোক রোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তন খুব কার্যকর 

0
106

বর্তমান সময়ে স্ট্রোক করে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। স্ট্রোক ঠেকাতে জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনা খুব প্রয়োজন। এই পরিবর্তনের ফলে স্ট্রোক রোধ সম্ভব হয়। নিচে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো স্ট্রোক ঠেকানোর জন্য।

প্রশ্ন: স্ট্রোক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পৌঁছে গেলে নাকি রোগী পুরো সেরে যান?

উত্তর: কত বড় স্ট্রোক হয়েছে, কোন ধরনের স্ট্রোক হয়েছে, রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্য কী রকম, ইত্যাদি বহু কিছুর উপর নির্ভর করে রোগী কতটা সুস্থ হবেন বা আদৌ হবেন কি না৷

প্রশ্ন: মাথায় জমা রক্ত গলিয়ে দিলেই তো হয়।

উত্তর: ব্রেনের রক্তনালীতে ডেলা জমলে তা গলানো যায় ঠিকই, যাকে থ্রম্বোলিসিস বলে ৷ তবে তার কার্যকারিতা কিন্তু প্রশ্নের উর্ধ্বে নয় ৷

প্রশ্ন: তবে আমরা যে শুনেছি এই পদ্ধতি স্ট্রোকের চিকিৎসায় যুগান্ত নিয়ে এসেছে?

উত্তর: এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে পর্যালোচনা হয়নি এখনও ৷ তা ছাড়া প্রচুর খরচও আছে৷

প্রশ্ন: খরচ হোক তবে রোগী ভাল হচ্ছেন কি না, প্রশ্ন সেটাই ৷

উত্তর: সে ব্যাপারে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি ৷

প্রশ্ন: আর ওই যে শিরা থেকে রক্তের ডেলা বার করে আনার চিকিৎসা?

উত্তর: থ্রম্বেক্টমি। না, এই পদ্ধতি প্রয়োগ করার কোনও অর্থ নেই৷

প্রশ্ন: কেন?

উত্তর: মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্তের ডেলা জমলে ওই নালী দিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ৷ ফলে মস্তিষ্কের যে অংশে রক্ত যোগান দিতো এই নালী, সেই অংশ রক্তের অভাবে তিন মিনিটের মধ্যে মরে যায় ৷ এ বার  যা-ই করুন না কেন, মৃত অংশে কি প্রাণ সঞ্চার করতে পারবেন?

প্রশ্ন: তা হলে তো স্ট্রোক হওয়া মানে সব শেষ?

উত্তর: তা নয় ৷ ওই অংশের কোষ মরলেও তার আশপাশের কোষগুলোকে যদি ভাল করে ট্রেনিং দেওয়া যায় তারা ওই ঘাটতি অনেকটাই মিটিয়ে দেয় ৷

প্রশ্ন: কীভাবে?

উত্তর: ফিজিওথেরাপি করে ৷ তার আগে চিকিৎসারও বিরাট ভূমিকা আছে ৷

প্রশ্ন: কিন্তু এর আগে যেমন বলা হলো অপারেশনের তো তেমন ভূমিকা নেই?

উত্তর: তা-ও আছে৷ তবে অনেক বুঝেশুনে করতে হয় ৷ করা যায় বলেই করে দিলাম, এমন হলে হবে না ৷ ওষুধপত্রের চেয়ে অপারেশন করলে যদি রোগী বেশি ভাল থাকেন তবেই অপারেশনের প্রশ্ন৷

প্রশ্ন: যেমন?

উত্তর: মাথার শিরা ছিঁড়ে স্ট্রোক হলে এবং রক্ত যদি ব্রেনের ভেতরে জমে থাকে, অপারেশন করতে গেলে প্রচুর সুস্থ কোষের ক্ষতি হয় ৷ তাতে ভাল হয় না প্রায় সময়ই ৷ সে ক্ষেত্রে ওষুধ এবং ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ–ই প্রধান চিকিৎসা ৷

প্রশ্ন: আর ব্রেনের উপরে জমলে?

উত্তর: রক্ত যদি ব্রেনের একদম উপরের অংশে জমে সুস্থ কোষগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে কনজারভেটিভ চিকিৎসার চেয়ে অপারেশনে বেশি ভাল ফল হয় অনেক সময় ৷

প্রশ্ন: কনজারভেটিভ চিকিৎসা বলতে?

উত্তর: ওষুধপত্র দেওয়া ও কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা ৷

প্রশ্ন: ওষুধে রক্ত গলে?

উত্তর: সময়ের সঙ্গে রক্ত নিজের নিয়মে মিলিয়ে যায় ৷ ওষুধ দেওয়া হয় অন্য আর যে ক্ষতি হয় ব্রেনে ও আরও যে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তা সামলাতে ৷

প্রশ্ন: যেমন?

উ: স্ট্রোক হলে রক্ত যতটা জমার তা তো জমেই, তার পাশাপাশি পানি জমে ব্রেনের ওই অংশ ফুলে যায় ৷ সুস্থ কোষগুলোর উপর চাপ দিতে থাকে ৷ ওষুধ দিয়ে এই চাপ সরানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে নতুন করে আর কোনও ক্ষতি না হয় ৷

প্রশ্ন: রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখারও চেষ্টা করা হয় নিশ্চয়ই?

উত্তর: সে তো বটেই ৷ না হলে নতুন করে অঘটন ঘটতে পারে ৷ তবে বাড়াবাড়ি করলে বিপদ আছে ৷ ৭০ বছরের মানুষের ক্ষেত্রে ১৬০–১৭০/৯০–১০০ প্রেশারই কিন্তু স্বাভাবিক ৷ তাকে আরও কমাতে গেলে ব্রেনে ঠিকভাবে রক্ত পৌঁছায় না, বিপদ বাড়ে ৷

প্রশ্ন: আচ্ছা, এই যে অপারেশনের কথা আগে বলা হলো তা কি খুলি কেটে করা হয়?

উত্তর: অবশ্যই ৷ না হলে ব্রেন পর্যন্ত পৌঁছাবেন কীকরে?

প্রশ্ন: খুলির হাড়টা পরে জুড়ে দেওয়া হয়?

উত্তর: যে অপারেশনের কথা এখানে বললাম, ক্র্যানিওটমি, তাতে হাড় তখনই জুড়ে দেওয়া হয় ৷ আর এক ধরনের অপারেশন আছে, যাকে বলে ডিকমপ্রেশন সার্জারি, তাতে খুলির কাটা অংশ পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয় ৷ ব্রেন স্বাভাবিক হয়ে গেলে পেট কেটে তাকে বের করে বসানো হয় জায়গা মতো ৷

প্রশ্ন: এ তো সাঙঘাতিক ব্যাপার! কাটা খুলি নিয়ে দিন কাটান রোগী?

উত্তর: দিন কাটানো মানে কি আর চলাফেরা, ওঠাবসা করা? ব্রেন ফুলে এমন অবস্থা হয়ে থাকে যে তা না কমা পর্যন্ত রোগী হাসপাতালে শুয়ে থাকেন ৷

প্রশ্ন: খোলা ব্রেনে সংক্রমণের আশঙ্কা তো থাকে?

উত্তর: ওষুধপত্র দেওয়া থাকে ৷ সমস্যা হয় না তেমন ৷

প্রশ্ন: তবে ও ভাবে খুলে রাখার কারণটা কী?

উ: স্ট্রোক হলে ব্রেন তো ফুলে যায় ৷ বেশি ফুলে গেলে খুলির মধ্যে জায়গার অভাব হয় ৷ তাই খুলি কেটে একটু জায়গা করে দেওয়া হয় ৷

প্র: এতো কাণ্ড করার পরে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন?

উ: বেঁচে থাকেন ৷

প্র: শুধু বেঁচে থাকেন! তা হলে আর লাভ কী?

উ: অনেক সময় বেঁচে থাকাটাই লাভ ৷

প্র: অর্থাৎ স্ট্রোক ঠেকানোর চেষ্টা করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ? আপনারা তো কিছু ওষুধও দেন অনেক সময় ৷ রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ ৷ সে সব তা হলে নির্দ্বিধায় খাওয়া যাবে?

উত্তর: ঠেকানোর চেষ্টা তো অবশ্যই করতে হবে ৷ এ ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকর জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা লাইফস্টাইল মডিফিকেশন ৷ তবে তা হলেই যে রোগ হবে না এমন নয় ৷ আবার এই ধরনের ওষুধপত্র খেয়ে এক ধরনের স্ট্রোক, যাকে ইস্কিমিক স্ট্রোক বলে, তা কিছুটা ঠেকানো গেলেও, অন্য ধরনের স্ট্রোক বা হেমারেজিক স্ট্রোকের চান্স কিন্তু বেড়ে যায় ৷ বাড়ে তার জটিলতাও ৷

প্র: তা হলে উপায়?

উ: ওই যে বলা হলো লাইফস্টাইল মডিফিকেশন ৷ তার সঙ্গে ডাক্তার বললে ওষুধও খাবেন ৷ কারণ তিনি ওষুধ দেবেন ভালমন্দ বিচার করে ৷

স্ট্রোক ঠেকাতে করণীয়:

• যত ছিপছিপে থাকবেন, তত চান্স কমবে বিপদের

• রক্তচাপ, সুগার ও কোলেস্টেরল–ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যা থাকলে নিয়ম মেনে ও প্রয়োজনে ওষুধ খেয়ে তাদের বশে রাখুন

• ঘাম ঝড়ানো ব্যায়াম করুন নিয়মিত

• পরিবারে কম বয়সে স্ট্রোকে মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে মাঝেমধ্যে একটু চেকআপ করাতে হবে

• হালকা স্ট্রোক, যাকে ট্রান্সিয়েন্ট ইস্কিমিক অ্যাটাক বলে, তার লক্ষণ দেখা দিলে, চলতে হবে ডাক্তারের পরামর্শমতো