চলে গেলেন পাকিস্তানের `মাদার তেরেসা’ রুখ ফাও

414

পাকিস্তানের মাদার তেরেসা খ্যাত রুখ ফাও আর নেই। তিনি জার্মানের নাগরিক ছিলেন। পাকিস্তানে এসে নিজের জীবন সেবায় নিয়োজিত করেছেন। পাকিস্তান থেকে কুষ্ঠু দূরীকরণে তার চেষ্টা অনরত ছিল। করাচির একটি বেসরকারী হাসপাতালে তিনি পরলোকগমন করেন।

মৃত্যুকালে রুথ ফাওয়ের বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বিগত ৫৭ বছর ধরে পাকিস্তানে কুষ্ঠর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। গত শুক্রবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে বৃহস্পতিবার তিনি মারা গেছেন।

ড. ফাও ১৯৬০ সালে প্রথম পাকিস্তানে কুষ্ঠ রোগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং কিছুদিন পরে ফিরে পাকিস্তানজুড়ে কুষ্ঠ ক্লিনিক খোলা শুরু করেন। তার অদম্য চেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৯৬ সালে ঘোষণা করা হয় যে কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে।

তার মৃত্যুতে পুরো পাকিস্তানে শোক নেমে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসী বলেন, ড. ফাও জার্মানিতে জন্ম নিলেও তার হৃদয় সবসময় পাকিস্তানেই ছিল। ড. রুথ সেই সময়ের তরুণ রাষ্ট্র পাকিস্তানে এসেছিলেন রোগাক্রান্ত মানুষের জীবনকে ভালো করতে, আর এর মাধ্যমে নিজের বাড়িও খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

চিকিৎসক হিসেবে শিক্ষাগ্রহণের পরে ড. ফাও ক্যাথলিক সিস্টারহুডে যোগ দেন। কুষ্ঠরোগের এই বিশেষজ্ঞ ১৯৬০ সালে পাকিস্তানে আসেন। পাকিস্তানে কুষ্ঠরোগ নিরসনে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক নিশান ই-কায়েদ-ই-আজম প্রদান করে পাকিস্তান।
চিকিৎসক ও খ্রিস্টান ধর্মযাজিকা রুথ ফাও সারাজীবন নিজেকে মানবসেবায় নিয়োজিত রাখেন।

রুথ ফাওয়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন পাকিস্তানের অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসি। এক বিবৃতিতে তিনি এই শোক জানান। রুথ ফাওয়ের শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হবে বলে বিবৃতি তিনি জানান।

রুথ ফাও অগণিত মানুষকে নতুন আশা যুগিয়েছিলেন, একাগ্র পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন মানবসেবার কোনও সীমানা থাকে না। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক সেবা নিয়ে গর্ববোধ করি এবং সামনের দিনগুলোতে তিনি আমাদের হৃদয়ে উজ্জ্বল এক প্রতীক হয়ে থাকবেন বলে আব্বাসী বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।

১৯২৯ সালে জার্মানির লিপজিগে জন্মগ্রহণ করেন রুথ ফাও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার আঘাতে তার ঘর-বাড়ি তছনছ হয়ে যায়। মেডিসিনে পড়াশোনা করার পর ১৯৬০ সালে মানবসেবা ও ধর্ম প্রচারের জন্য জার্মানি থেকে ভারতবর্ষের উদ্দেশে রওনা করেছিলেন ফাও।

ভিসা-বিষয়ক জটিলতায় তাকে পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থান করতে হয়। ওই সময় করাচির একটি এলাকায় কুষ্ঠ রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। রোগীদের অমানুষিক যন্ত্রণা ফাওকে ব্যথিত করে।

তিনি তাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। কুষ্ঠ রোগীদের সেবা দিতে একটি খুপড়ি ঘর তুলে সেখানে গড়ে তোলেন নিরাময় ক্লিনিক। ধীরে ধীরে তার সেবাকার্যক্রম বিস্তৃত হয়ে পাকিস্তানের সব প্রদেশেই ছড়িয়ে আছে। তার প্রচেষ্টাতেই ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানকে কুষ্ঠমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কুষ্ঠমুক্ত ঘোষিত এশিয়ার প্রথম দেশ পাকিস্তান।

শুধু কুষ্ঠ চিকিৎসাই নয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ও রুথ ফাও ছুটে গেছেন অসহায় মানুষের পাশে। দুর্গত মানুষদের সেবায় নিয়োজিত রেখেছিলেন নিজেকে। মানবসেবায় ফাওয়ের অকৃত্রিম অবদানের জন্য অনেকেই তার নাম দিয়েছিলেন পাকিস্তানের মাদার তেরেসা।

বিশ্ব গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর ঢালাওভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। পাকিস্তান ও জামার্নির মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনে ফাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

সূত্র: দ্য হিন্দু, ডন, বিবিসি, জিও নিউজ ও আল জাজিরা