পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে পরাজিত হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কলকাতায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তুলে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এই অনড় অবস্থানের ফলে রাজ্যে নজিরবিহীন এক সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট নিরসনের দায় রাজ্যপাল আর এন রবির ওপর বর্তাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) সন্ধ্যার দিকে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পশ্চিমবঙ্গের এই নেত্রী বলেছেন, ‘আমি হারিনি, তাই রাজভবনেও যাব না। পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
এর আগে সোমবার নির্বাচনি ফলাফলে পরাজয়ের ইঙ্গিত পাওয়ার পরপরই জরুরি ভিডিও বার্তায় ‘বাঘের বাচ্চার’ মতো লড়াই করার অঙ্গীকার করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের এই মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে মমতা বলেছেন, নির্বাচনে তিনি হারেননি; বরং বিজেপি ‘লুটপাটের’ মাধ্যমে ফল ছিনিয়ে নিয়েছে।
মমতার এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা তৈরি হলেও ভারতের নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রয়োজন নাও হতে পারে। বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যদি বিজয়ী দল সরকার গঠনের দাবি জানায় এবং রাজ্যপাল তাদের আমন্ত্রণ জানান তাহলেই সরকার গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ আগামী ৭ মে শেষ হচ্ছে। ফলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া গুছিয়ে নিতে বিজেপির হাতে আর মাত্র দুই দিন সময় আছে।
গতকাল ভবানীপুর আসনে নিজের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর মমতা অভিযোগ করেন, এই নির্বাচনে অন্তত ১০০টি আসন চুরি করা হয়েছে। তিনি একে ‘লুট, লুট এবং লুট’ বলে অভিহিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ এনে মমতা বলেছেন, কমিশন ‘নোংরা খেলা’ খেলছে। তৃণমূলের আসল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি নয়, বরং নির্বাচন কমিশন।
কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, এভাবেই তারা মহারাষ্ট্র, হারিয়ানা, বিহার ও এখন বাংলা থেকে নির্বাচন চুরি করেছে।
গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ৭১ বছর বয়সি এই নেত্রী বলেন, বিচার বিভাগ যখন সক্রিয় থাকে না, নির্বাচন কমিশন যখন পক্ষপাতদুষ্ট হয় এবং সরকার যখন একদলীয় শাসন চায়, তখন বিশ্বের কাছে একটি ভুল বার্তা যায়।
মমতা বলেছেন, একটি ভোটকেন্দ্রে তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। যে কারণে গতকাল তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে আসতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমার পেটে ও পিঠে লাথি মারা হয়েছে। সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং আমাকে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। একজন নারী হিসেবে আমার সাথে অভব্য আচরণ করা হয়েছে।’
ভারতের কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী যদি এমন আচরণ করে, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই। এর আগেও কেন্দ্রে বিজেপি সরকার দেখেছি, কিন্তু এমনটা কখনো দেখিনি।
পরবর্তী কৌশল খোলসা না করলেও মমতা বলেছেন, ‘ইনডিয়া’ জোটের নেতারা তার সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া তৃণমূলের ওপর হামলা ও কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা তদন্তে পাঁচজন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।
এদিকে রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের ঘোর বিরোধী হলেও নির্বাচনের পরপরই মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বিজেপিকে ‘ভোট চোর’ আখ্যা দিয়েছেন, কংগ্রেসের কেউ কেউ এবং অন্যান্যরা তৃণমূলের হারে খুশি হতে পারেন। কিন্তু তাদের বুঝতে হবে, আসাম ও বাংলার জনমত চুরি করা ভারতীয় গণতন্ত্র ধ্বংসের লক্ষ্যে বিজেপির বড় একটি পদক্ষেপ। ক্ষুদ্র রাজনীতি ভুলে এটি ভারতের স্বার্থে দেখা উচিত।
এর আগে, সোমবারও মমতার ১০০ আসন চুরির দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাহুল বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি আসাম ও বাংলায় ভোট চুরি করেছে। মধ্যপ্রদেশ, হারিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের মতো একই কৌশল এখানেও প্রয়োগ করা হয়েছে।
Mytv Online