রমজান হলো আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত সুদীর্ঘ পথ। নিজেকে পরিবর্তন করার এক মহান সময় ,আল্লাহ তাআলা এই মাসকে এমন সব বৈশিষ্ট্যে দিয়ে সুসজ্জিত ও মর্যাদাবান করেছেন, যা অন্য কোনো মাসে একত্রে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
১. রমজানের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া
অর্জন করা অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভীতি প্রদর্শন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেনঃ-"হে ঈমানদারগণ!তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।"
(সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)
রোজার উদ্দেশ্য শুধু দিনভর উপবাস থাকা না, বরং অন্তরে যথাযথ আল্লাহভীতি জাগ্রত করা। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা কঠিন, কিন্তু গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এর চেয়ে বেশি কঠিন। তাই রোজা আমাদের সেই কঠিন প্রশিক্ষণই দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ-যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার না খেয়ে থাকার আল্লাহর কাছে কোনো মূল্য নেই। (সহিহ বুখারি)
২. এই মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে আল কুরআন
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ- "রমজান মাস হলো সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ প্রাপ্তিদের জন্য সুষ্পষ্ট পথনির্দশন এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী"।
এই একটি কারণই রমজানকে মহিমান্বিত করার জন্য যথেষ্ট। কুরআন আল্লাহর বাণী, আর সেই বাণী অবতীর্ণ হয়েছে এই বরকতময় মাসে।
রমজানে জিব্রাইল (আ.) প্রতি বছর এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কুরআন পর্যালোচনা করতেন। তাই রমজান মানেই কুরআনের সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
(সহিহ বুখারি)
৩."লাইলাতুল কদর( ভাগ্য রজনী)
লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।"
(সূরা আল-কদর)
হাজার মাসকে হিসাব করলে প্রায় ৮৩ বছরের মত ইবাদতের সমান সওয়াব এক রাতে। যা জীবনের পুরোটা সময়।
রাসূল সা. বলেনঃ-যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম)
৪.রমজান গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার মাস
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ত্যাগ করো। (সূরা আল-আনআম ৬:১২০)
আমরা মানুষ,ভুল আমাদের হয়।কখনো খামখেয়ালিপনায়, কখনো নফসের প্রলোভনে, আবার কখনো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমরা আল্লাহর নাফরমানি করে ফেলি। অনেক সময় এমন গুনাহ করি যা মানুষ দেখে না। আমরা ভয় করি“মানুষ জেনে গেলে সম্মান নষ্ট হবে।” কিন্তু খুব কমই ভাবি—আল্লাহ তো সবই দেখছেন।
আমরা মানুষের দৃষ্টিকে আমরা ভয় করি, অথচ হাশরের সেই ভয়ংকর দিনের কথা ভুলে যাই,যখন আমাদের হাত, পা, চোখ, কান,সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তখন কোথায় পালাবো? কার কাছে আশ্রয় নেবো?
রমজান এই ভুলে যাওয়া অনুভূতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এই অনুভূতিই তো প্রকৃত তাকওয়া(আল্লাহর ভয়) এই সচেতনতাই গুনাহ থেকে বাঁচার প্রথম ধাপ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “রোজা হলো ঢাল।” — সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
এই ঢাল গুনাহের বিরুদ্ধে। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে,মিথ্যা ও গীবতের বিরুদ্ধে, রাগ, হিংসা ও প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে। যদি কেউ এই ঢালকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে,তবে সে অবশ্যই নিজেকে অনেক পাপ থেকে রক্ষা করতে পারবে। তাই আমরা সবাই চেষ্টা করি আমার কথা যেন পবিত্র হয়,আমার দৃষ্টি যেন সংযত হয়,আমার লেনদেন যেন সৎ হয়, আমার চলাফেরা যেন শালীন হয়।
৫. এই মাসে বান্দার গুনাহকে মাফ করে দেওয়া হয়
রমজান শুরু হলেই রহমতের সবগুলো দরজা খুলে দেওয়া হয়। তাই এটি অতীতের ভুল-ত্রুটি থেকে ফিরে আসার উত্তম সময় সুযোগ।
৬. জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়
রাসূল (সা.) বলেনঃ- রমজান এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়,জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এটি আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ—যাতে বান্দা সহজেই ভালো কাজের দিকে সহজে এগিয়ে যেতে পারে।
৭. রোজাদারের দোয়া কবুল হওয়ার মাস
রমজান হলো দোয়ার এক বিশেষ সময়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন:“তোমরা যখন আমার দিকে প্রার্থনা করবে, আমি তোমাদের শুনব।নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে, তাদের প্রার্থনা আমি গ্রহণ করি।”
— সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৬
রাসূল ﷺ আরো বলেন: “নিশ্চয়ই রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় একটি দোয়া আছে, যা প্রত্যাখ্যান করা হয় না।”
এই মাসে রোজাদারের দোয়া বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। তাই আমরা প্রত্যেক সেহরি ও ইফতারের সময়, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আমাদের ব্যক্তিগত মনের কথা, প্রয়োজন ও ভালোবাসার প্রার্থনা—সবকিছু আল্লাহর কাছে পৌঁছায় দিব।
এবং বিশেষত বিশেষ করে আমাদের যাদের মা-বাবা আত্মীয়স্বজন অন্ধকার কবরে আছেন তাদের জন্য দোয়া করবো।
৮. এই মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়
আমি অবশ্যই তাদের (মানুষের) জন্য তোমার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর তাদের সামনে, পেছন, ডান ও বাম দিক থেকে তাদের ওপর আক্রমণ করব...’" (সূরা আরাফ: ১৬-১৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—রমজান এলে শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। (সহিহ বুখারি)
শয়তান আমাদের চিরশত্রু। সে সবসময় আমাদেরকে ধোকা দেওয়ায় ব্যস্ত থাকে এবং নানান কৌশল অবলম্বন করে,
চতুর্দিক থেকে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়। ধোঁকায় ফেলতে চায় তাই তাকে আল্লাহ তা'আলা বন্দি করে রাখেন। তাই এ মাসে জীবন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ আমাদের সামনে থাকে।
৯. রোজাদারের পুরস্কার আল্লাহ নিজে দিবেন
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন—রোজা আমার জন্য, আর আমিই তার প্রতিদান দেব। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এটি রোজার সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রমাণ।
১১. দানের সওয়াব বৃদ্ধি পায়
যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়,সর্বজ্ঞ।
(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৬১)
—রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন। (সহিহ বুখারি)
তাই আমরা এই রমজানে উদার হয়ে গরিব ও অসহায়দের প্রতি সহনশীল এবং বেশি বেশি দান করবো। দানের মাধ্যমে আমাদের বিপদ-আপদ মুসিবত কেটে যায় ।
১২. তারাবির নামাজ—কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার উত্তম উপায়
রমজানে তারাবির মাধ্যমে পুরো কুরআন শোনার সুযোগ হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
তাই যারা আমরা কুরআন পড়তে জানিনা কিংবা কুরআন খতম করার সম্ভব হয়ে ওঠেনা, তারা অবশ্যই এই রমজান তারাবি ধারাবাহিকভাবে পড়ার চেষ্টা করব, যাতে আমাদের কোরআন খতম নামাজের মাধ্যমে হয়ে যায়।
১৩. ইতিকাফ—
লাইলাতুল কদর পাওয়া এবং নিজেকে
বদলে নেওয়ার নিরিবিলি সময়
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছর শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। (সহিহ বুখারি)
ইতিকাফ হলো আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ। নিজেকে দুনিয়াবী সমস্ত কিছু থেকে বিরত রেখে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়, মহান রবের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মসজিদে অবস্থান নেওয়া হয়।
১৪. রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
মানুষের জন্য যা সহ্য করা কষ্ট, আল্লাহর কাছে সেটি ভালোবাসা।
১৫. যাকাত—সম্পদকে পবিত্র করার ইবাদত
যাকাত ইসলামের মৌলিক ভিত্তির একটি ভিত্তি
রমজান মাসেই অধিকাংশ মুসলিম তাদের ফরজ যাকাত আদায় করেন।যদিও যাকাত নির্দিষ্ট সম্পদের উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে ফরজ, তবুও রমজানের বরকত ও সওয়াবের আশায় অনেকেই এই মাসে যাকাত প্রদান করে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে একাধিক স্থানে সালাত ও যাকাতকে একসাথে উল্লেখ করেছেন—যা যাকাতের গুরুত্ব সুস্পষ্ট।
যাকাত কেবল দান বা অনুগ্রহ না, এটি সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম এবং সমাজের দারিদ্র্য মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরাম( রাঃ) যাকাত আদায়ের বিষয়ে কঠোরভাবে নির্দেশ দিতেন এবং যাকাতকে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি)
রমজানে আমরা যেমন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করি পাশাপাশি যেন গরিবের কষ্টও উপলব্ধি করি। তাই এই মাসে যাকাত আদায় শুধু ফরজ পালন করা না,এটি সহানুভূতি, ন্যায়বিচার ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য সুযোগ।
এই সম্পদ আমার না, এগুলো আল্লাহর আমানত। আর সেই আমানতের হক আদায় করাই ঈমানের প্রকৃত পরিচয়। তাই আমরা যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের নিকটস্থ অভিজ্ঞ আলেমদের সহযোগিতা নিব, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করবো , আমাদের যাকাতটা যেন যথাযথভাবে কুরআন হাদিসের আলোকে আদায় হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখবো। যারা যাকাতের অধিক হকদার তাদেরকেই অগ্রাধিকার দিব ।
যদি আমরা এই মাসকে সত্যিকার অর্থেই গ্রহণ করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন বদলে যাবে। রমজান আমাদের সামনে এক নতুন সূচনার দরজা খুলে দিবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: মুফতি জালাল উদ্দিন জামালি
Mytv Online