দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অলি আহমদকে হারিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং এই পদের কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে নতুন করে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা ও বিশ্লেষণ। প্রশ্ন উঠেছে, সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক হয়েও রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন বা কী পারেন না?
এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটির ভূমিকা অনেকটাই ‘আলংকারিক’। বাংলাদেশের চলমান সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মূল নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার হাতে, আর রাষ্ট্রপতি হন কেবল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কেবল দুটি কাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারেন। একটি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ অপরটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সব কাজ সম্পাদনে রাষ্ট্রপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সংসদ আহ্বান করা, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, বিলে সই করা, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা বা ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ চূড়ান্ত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে কোনো বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে দেশের কোনো আদালতও প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির তেমন কোনো ক্ষমতা নাই। তিনি মনে করেন, শাসন ব্যবস্থায় যারা বাস্তবে ক্ষমতায় থাকেন, তাদের ইচ্ছার বাইরে রাষ্ট্রপতির তেমন কিছু করার সুযোগ থাকে না।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতার মূল উৎস
কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ বা আপদকালীন পরিস্থিতিতে এই পদটিই হয়ে উঠতে পারে ক্ষমতার মূল উৎস। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি ক্ষমতার নেপথ্যে থাকা কোনো শক্তি, আন্তর্জাতিক চাপ বা সমর্থন থাকে, তবে রাষ্ট্রপতি অনেক সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ক্ষমতার আড়ালে থাকা খেলোয়াড়রা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে যদি কিছু করাতে চান, তাহলে উনার অনেক ক্ষমতা। উনি সেনা সমর্থিত সরকার আনতে পারেন, জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন, সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।
এছাড়া সংবিধানই রাষ্ট্রপতি পদকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে যেমন কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না, তেমনি তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সব বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা একমাত্র রাষ্ট্রপতিরই আছে। তার যেকোনো উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে না কেউ।
ঐতিহাসিক সংকট ও রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা
সংসদীয় পদ্ধতি চালু হওয়ার পরও বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বেশ কয়েকটি সংকটময় মুহূর্ত এসেছে, যখন রাষ্ট্রপতিকে একক বা স্বাধীনভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।
বিবিসি বাংলার সংকলিত তথ্যে এমন কিছু নজির উঠে এসেছে। যেমন-
১৯৯৬ সালের সেনা বিদ্রোহ প্রতিহতকরণ: ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধানের তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সেনাপ্রধানের নির্দেশে ঢাকায় সৈন্য সমাবেশ করার চেষ্টা করা হলে রাষ্ট্রপতি অনুগত বাহিনীর মাধ্যমে সেই চেষ্টা প্রতিহত করেন এবং সেনাপ্রধানকে অব্যাহতি দিয়ে আটক করা হয়।
সাহাবুদ্দীন আহমদের দৃঢ়তা: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে সাবেক বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত ‘জননিরাপত্তা আইন’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান, যা সরকারের সঙ্গে তার তিক্ততা তৈরি করে। পাঁচ বছরের মেয়াদে তার নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ছিলেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে সমাধিতে শ্রদ্ধা না জানানো ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করায় ২০০২ সালে বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে মাত্র ৭ মাসের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের উপদেষ্টা পদ গ্রহণ: ২০০২ সালের ৬ সেপ্টম্বর বিএনপির হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। বাংলাদেশের ১৮তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ২০০৬ সালে তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখে তিনি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রয়োগ।
দলীয় আধিপত্য বনাম ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দলীয় আধিপত্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে তার স্বাধীন ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া হয় না, কারণ দলগুলো সবসময়ই তাদের অনুগত বা পছন্দের ব্যক্তিকে এই পদে বসাতে চায়।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, যদি তিনি কাজ করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা করতে দেওয়া হয় না। দলগুলোই রাষ্ট্রপতিকে পদে বসায়, তাই তিনি স্বাধীন নন।
একই ধরনের কথা বলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদও। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে একসময় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতি চালুর পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সংকুচিত করা হয় এবং দলগুলো তাদের অনুগতদেরই এই আসনে বসাতে পছন্দ করে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিরপেক্ষতার পুরো বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন এবং তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ধরনের ওপর। নবনির্বাচিত ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ও নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য বজায় রাখার এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং এই পদের কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে নতুন করে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা ও বিশ্লেষণ। প্রশ্ন উঠেছে, সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক হয়েও রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন বা কী পারেন না?
এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটির ভূমিকা অনেকটাই ‘আলংকারিক’। বাংলাদেশের চলমান সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মূল নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার হাতে, আর রাষ্ট্রপতি হন কেবল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কেবল দুটি কাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারেন। একটি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ অপরটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সব কাজ সম্পাদনে রাষ্ট্রপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সংসদ আহ্বান করা, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, বিলে সই করা, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা বা ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ চূড়ান্ত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে কোনো বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে দেশের কোনো আদালতও প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির তেমন কোনো ক্ষমতা নাই। তিনি মনে করেন, শাসন ব্যবস্থায় যারা বাস্তবে ক্ষমতায় থাকেন, তাদের ইচ্ছার বাইরে রাষ্ট্রপতির তেমন কিছু করার সুযোগ থাকে না।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতার মূল উৎস
কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ বা আপদকালীন পরিস্থিতিতে এই পদটিই হয়ে উঠতে পারে ক্ষমতার মূল উৎস। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি ক্ষমতার নেপথ্যে থাকা কোনো শক্তি, আন্তর্জাতিক চাপ বা সমর্থন থাকে, তবে রাষ্ট্রপতি অনেক সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ক্ষমতার আড়ালে থাকা খেলোয়াড়রা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে যদি কিছু করাতে চান, তাহলে উনার অনেক ক্ষমতা। উনি সেনা সমর্থিত সরকার আনতে পারেন, জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন, সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।
এছাড়া সংবিধানই রাষ্ট্রপতি পদকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে যেমন কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না, তেমনি তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সব বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা একমাত্র রাষ্ট্রপতিরই আছে। তার যেকোনো উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে না কেউ।
ঐতিহাসিক সংকট ও রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা
সংসদীয় পদ্ধতি চালু হওয়ার পরও বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বেশ কয়েকটি সংকটময় মুহূর্ত এসেছে, যখন রাষ্ট্রপতিকে একক বা স্বাধীনভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।
বিবিসি বাংলার সংকলিত তথ্যে এমন কিছু নজির উঠে এসেছে। যেমন-
১৯৯৬ সালের সেনা বিদ্রোহ প্রতিহতকরণ: ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধানের তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সেনাপ্রধানের নির্দেশে ঢাকায় সৈন্য সমাবেশ করার চেষ্টা করা হলে রাষ্ট্রপতি অনুগত বাহিনীর মাধ্যমে সেই চেষ্টা প্রতিহত করেন এবং সেনাপ্রধানকে অব্যাহতি দিয়ে আটক করা হয়।
সাহাবুদ্দীন আহমদের দৃঢ়তা: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে সাবেক বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত ‘জননিরাপত্তা আইন’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান, যা সরকারের সঙ্গে তার তিক্ততা তৈরি করে। পাঁচ বছরের মেয়াদে তার নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ছিলেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে সমাধিতে শ্রদ্ধা না জানানো ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করায় ২০০২ সালে বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে মাত্র ৭ মাসের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের উপদেষ্টা পদ গ্রহণ: ২০০২ সালের ৬ সেপ্টম্বর বিএনপির হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। বাংলাদেশের ১৮তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ২০০৬ সালে তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখে তিনি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রয়োগ।
দলীয় আধিপত্য বনাম ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দলীয় আধিপত্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে তার স্বাধীন ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া হয় না, কারণ দলগুলো সবসময়ই তাদের অনুগত বা পছন্দের ব্যক্তিকে এই পদে বসাতে চায়।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, যদি তিনি কাজ করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা করতে দেওয়া হয় না। দলগুলোই রাষ্ট্রপতিকে পদে বসায়, তাই তিনি স্বাধীন নন।
একই ধরনের কথা বলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদও। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে একসময় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতি চালুর পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সংকুচিত করা হয় এবং দলগুলো তাদের অনুগতদেরই এই আসনে বসাতে পছন্দ করে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিরপেক্ষতার পুরো বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন এবং তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ধরনের ওপর। নবনির্বাচিত ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ও নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য বজায় রাখার এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা