শিশুর সময় ধারণা: ছোটবেলা থেকেই সময়কে চিনতে শেখা

আপলোড সময় : ১৪-১০-২০২৬ ০৮:৩০:০০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-১০-২০২৬ ০৮:৩৩:১৯ অপরাহ্ন
আফসানা ইয়াসমিন অর্থি: সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু একজন শিশু জন্মের পর থেকেই সময়ের গুরুত্ব বুঝে পৃথিবীতে আসে না। সময়ের ধারণা তাকে ধীরে ধীরে শিখতে হয়। কখন ঘুমাতে হবে, কখন খেলতে হবে, কখন পড়তে বসতে হবে, কখন খেতে হবে কিংবা কখন কোনো কাজ শেষ করতে হবে- এসব দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই একটি শিশুর মধ্যে সময় সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।

শিশুকে সময় শেখানো মানে শুধু ঘড়ির কাঁটা চিনতে শেখানো নয়। সময় শেখানো মানে তাকে অপেক্ষা করতে, কাজের ধারাবাহিকতা বুঝতে, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে এবং নিজের কাজের জন্য দায়িত্ব নিতে শেখানো।

একটি ছোট শিশু হয়তো জানে না ৩০ মিনিট কতটা সময়। কিন্তু সে বুঝতে পারে, গল্প শোনার পর ঘুমাতে যেতে হয়, নাশতার পর স্কুলে যেতে হয় কিংবা খেলাধুলার পর খেলনা গুছিয়ে রাখতে হয়। এই দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোই তার সময় ধারণার প্রথম ভিত্তি।

শিশুর কাছে সময়কে সহজ করে তুলতে হবে

ছোট শিশুকে যদি বলা হয়, ২০ মিনিট পর তোমাকে পড়তে বসতে হবে, সে হয়তো সময়টির অর্থ বুঝবে না। তার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘এই খেলাটি শেষ করার পর আমরা পড়তে বসব।’ অর্থাৎ শিশুর বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সময়কে তার পরিচিত কাজের সাথে যুক্ত করতে হবে।

সকালে ঘুম থেকে ওঠা, দাঁত ব্রাশ করা, নাশতা করা, স্কুলের প্রস্তুতি নেওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা, বিশ্রাম এবং ঘুম- এসবকে একটি নির্দিষ্ট ধারায় আনলে শিশুর মনে সময়ের একটি স্বাভাবিক কাঠামো তৈরি হয়।

রুটিন শিশুকে নিরাপত্তা দেয়

শিশুর জন্য একটি বাস্তবসম্মত দৈনিক রুটিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। রুটিন মানে সারাদিন শিশুকে কাজের মধ্যে আটকে রাখা নয়। বরং দিনের কোন সময়ে কী হতে পারে, সে সম্পর্কে একটি পূর্বানুমান তৈরি করা।

যে শিশু জানে, স্কুল থেকে ফিরে খাবার খাবে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে, তারপর পড়বে এবং এরপর খেলবে, তার কাছে দিনের ঘটনাগুলো অনেক বেশি পূর্বানুমানযোগ্য হয়। এই পূর্বানুমান শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। একই সাথে ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধও বাড়ায়।

তবে রুটিন তৈরি করার সময় শিশুর বয়স, ব্যক্তিত্ব, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি শিশুর সময়ের প্রয়োজন ও কাজের গতি এক নয়।

শিশুকে অপেক্ষা করতেও শেখাতে হবে

সময় ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অপেক্ষা করার ক্ষমতা। শিশু চাইলে সাথে সাথে সবকিছু পেয়ে যাবে- এমন অভ্যাস তৈরি হলে তার মধ্যে অপেক্ষা করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তাকে অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা দিতে হবে। যেমন, এখন মা ফোনে কথা বলছে, কথা শেষ হলে তোমার সাথে খেলব।

এভাবে শিশুকে বোঝানো যায় যে সব কাজ একই সময়ে করা সম্ভব নয় এবং প্রত্যেক কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন।

সময় ব্যবস্থাপনায় শিশুর অংশগ্রহণ

শিশুর হয়ে সবকিছু করে দিলে সে সময় ব্যবস্থাপনা শেখার সুযোগ কম পায়। বরং বয়স অনুযায়ী তাকে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া উচিত। যেমন, তুমি আগে ব্যাগ গুছাবে, নাকি পোশাক গুছাবে? অথবা, খেলার জন্য তোমার ৩০ মিনিট আছে। এই সময়ের মধ্যে কোন খেলাটি খেলতে চাও? এতে শিশু সময়ের সীমা বুঝতে শেখে এবং নিজের কাজের পরিকল্পনায় অংশ নিতে পারে।

ভুল করলে শাস্তি নয়, শেখার সুযোগ

শিশু সময়মতো কোনো কাজ শেষ করতে না পারলে তাকে অলস, অবাধ্য বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে দেওয়া উচিত নয়। প্রথমে বুঝতে হবে, সে কেন কাজটি শেষ করতে পারেনি।

হয়তো কাজটি তার বয়সের তুলনায় কঠিন ছিল। হয়তো নির্দেশনা পরিষ্কার ছিল না। হয়তো সে খেলায় এতটাই মনোযোগী ছিল যে সময়ের কথা ভুলে গেছে। আবার কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখা বা কাজ পরিবর্তন করার বিষয়টিও কঠিন হতে পারে। তাই ভুলকে শাস্তির কারণ না বানিয়ে শেখার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

খেলতে সময় দেওয়া জরুরি

শিশুর সময় ব্যবস্থাপনার অর্থ শুধু পড়াশোনার সময় বাড়ানো নয়। শিশুর জীবনে খেলাধুলা, সৃজনশীলতা, বিশ্রাম, পরিবারের সাথে সময় কাটানো এবং মুক্তভাবে নিজের মতো থাকার সময়ও প্রয়োজন।

একটি শিশুর প্রতিটি মুহূর্তকে পড়াশোনা, কোচিং, পরীক্ষা ও নানা কার্যক্রম দিয়ে পূর্ণ করে দিলে সে হয়তো ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু তার শৈশবের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সময় ব্যবস্থাপনা মানে কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

প্রযুক্তির সময়ও নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন

বর্তমান সময়ে শিশুর সময় ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্ক্রিন ব্যবহার। মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশন শিশুর জীবনের সম্পূর্ণ অংশ হয়ে গেলে পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগে প্রভাব পড়তে পারে। তাই বয়স উপযোগী নিয়ম তৈরি করা দরকার।

শুধু ‘মোবাইল ধরবে না’ বলার পরিবর্তে শিশুকে বিকল্প আনন্দের সুযোগ দিতে হবে- বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, গল্প বলা, পরিবারের সাথে সময় কাটানো কিংবা বাইরে প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো।

অভিভাবকই শিশুর প্রথম উদাহরণ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশু শুধু আমাদের কথা শুনে শেখে না; আমাদের আচরণ দেখেও শেখে। অভিভাবক যদি নিজেই প্রতিনিয়ত সময়ের কাজ সময়মতো না করেন, কোথাও যাওয়ার সময় নিয়মিত দেরি করেন কিংবা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুকে সময়ের মূল্য বোঝানো কঠিন হবে। তাই শিশুকে সময় সচেতন করতে হলে প্রথমে আমাদের নিজেদের সময় সচেতন হতে হবে।

শিশুকে সময় শেখানো মানে তার শৈশবকে ঘড়ির কাঁটায় বেঁধে দেওয়া নয়। বরং তাকে শেখানো- সময় মূল্যবান, কাজের একটি ক্রম আছে, অপেক্ষারও মূল্য আছে এবং নিজের দায়িত্ব নিজেকেই ধীরে ধীরে নিতে হয়।

আজ যে শিশু নিজের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে রাখে, সময়মতো ঘুমাতে যায়, খেলাধুলা ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য রাখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অপেক্ষা করতে শেখে, আগামী দিনে সেই শিশুই নিজের জীবনকে আরও সচেতনভাবে পরিচালনা করতে পারবে। শিশুর সময় ধারণা তৈরি হয় ঘড়ি দেখে নয়, জীবনের প্রতিদিনের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে।

লেখক: গবেষক ও চাইল্ড কাউন্সিলর
aurthi_01@yahoo.com
 


 __________________________________________________________

MyTv Bhaban, 155, 150/3, Hatirjheel, Dhaka-1219

Phone. ☎ +880255128896 ; Fax. +880255128899

Email. news@mytvbd.tv

web: www.mytvbd,www.mytvbd.com