পুলসিরাত পার হলেই কি জান্নাত নিশ্চিত?

আপলোড সময় : ২৩-১০-২০২৬ ১১:৫০:৪৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-১০-২০২৬ ১২:১২:২২ অপরাহ্ন
ইবাদত-বন্দেগিতে পরিপূর্ণ জীবন পার করে পুলসিরাতের মতো কঠিন পথ অনায়াসে পেরিয়ে যাওয়ার পরও কি মানুষ  জান্নাত থেকে বঞ্চিত হতে পারে? উত্তর-হ্যাঁ, পারে। বান্দার হক বা মানুষের পাওনা পরিশোধ না করলে জান্নাতের ঠিক দোরগোড়ায় এসে আটকে যেতে হবে ‘কানতারা’নামক এক  আদালতে।

কেয়ামতের ময়দানের সেই মহাপ্রলয়ের দিনের কথা চিন্তা করুন,
মাথার মাত্র এক বিঘত ওপরে যখন সূর্য তীব্র উত্তাপ ছড়াবে,
মানুষ নিজের ঘামে হাবুডুবু খাবে। এরপর পার হতে হবে পুলসিরাত-যা চুলের চেয়েও সূক্ষ, তলোয়ারের চেয়েও ধারালো, আর তার নিচে গর্জন করতে থাকবে জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখা।
কোটি কোটি মানুষ যেখানে ছিটকে পড়বে সেই অন্ধকার গহ্বরে, 
সেখানে মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহে হয়তো আপনি বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবেন সেই ভয়াবহ পথ।
পার হয়ে সামনে তাকাতেই দূর থেকে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য-আলো ঝলমল করছে, জান্নাতের সুবাস ভেসে আসছে, সুমহান রবের দিদারের দরজা প্রায় উন্মুক্ত। মনে তখন বাঁধভাঙা আনন্দ-"আমি বেঁচে গেছি! জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছি!" কিন্তু ঠিক জান্নাতের প্রবেশদ্বারের আগেই আপনাকে থমকে দাঁড়াতে হবে। কারণ সেখানে অপেক্ষা করছে বান্দার হকের হিসাবের পুল, যার নাম ‘কানতারা’।

কানতারা: হকের শেষ আদালত
হাদিসে রাসূল (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
কানতারার এক পরিষ্কার ও ভয়ংকর বিবরণ দিয়েছেন,
“মুমিনগণ যখন জাহান্নাম (পুলসিরাত) থেকে নাজাত পেয়ে যাবে, 
তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে ‘কানতারা ’ নামক একটি সেতুতে তাদের সবাইকে আটকে রাখা হবে। অতঃপর দুনিয়ায় থাকাকালে তাদের পরস্পরের মধ্যে যে জুলুম-অন্যায় ও বিরোধ ছিল, তার কিসাস (বিনিময় বা প্রতিশোধ) নেওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা একে অপরের হক পরিশোধ করে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি: ২৪৪০)

একবার ভেবে দেখুন সেই সময়ের দৃশ্য! যাদের হক আমরা দুনিয়ায় নষ্ট করেছিলাম-হতে পারে ব্যবসায় কাউকে ঠকানো, ভাইয়ের পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, কর্মচারীর পাওনা আটকে রাখা কিংবা কারো ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মানহানি করা-তারা সবাই সেদিন কাতার বেঁধে দাঁড়াবে। সেদিন পরিশোধ করার মতো কোনো কাগজী মুদ্রা বা সোনা-রূপা থাকবে না।

পাহাড়সম নেকি নিয়েও জান্নাতের দরজায় ভিখারি  
রাসূল (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিঃস্ব ব্যক্তির আসল পরিচয় তুলে ধরেছেন, রাসূল (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি জানো প্রকৃত নিঃস্ব কে?” 
সাহাবিরা বললেন, “আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই, সে-ই তো নিঃস্ব।”রাসূল (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বললেন,
“আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব তো সে, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, 
রোজা ও জাকাতের বিশাল পাহাড়সম নেকি নিয়ে উপস্থিত হবে। 
কিন্তু সে দুনিয়ায় অমুককে গালি দিয়েছিল, অমুকের ওপর অপবাদ দিয়েছিল, অমুকের সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, অমুককে হত্যা করেছিল কিংবা প্রহার করেছিল। তখন তার নেকিগুলো থেকে এই পাওনাদারদের হক পরিশোধ করা হবে। এভাবে পাওনা শোধ হওয়ার আগেই যদি তার নেকি শেষ হয়ে যায়, তবে পাওনাদারদের পাপগুলো তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে; এরপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”(সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা লেনদেন ও বান্দার হকের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন। মাপে কম দেওয়া ও মানুষের হক মারার বিষয়ে সূরা আল-মুতাফফিফিনে বলা হয়েছে:
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো নেয়, আর যখন মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।”
(সূরা আল-মুতাফফিফিন: ১-৩)

আজ মানুষ সামান্য দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য চুক্তি ভঙ্গ করে, 
প্রতারণা করে এবং দুর্বলকে ঠকিয়ে নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ায়।
কিন্তু অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হলেও ছেড়ে দেওয়া হয় না। 
আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তুমি কিছুতেই মনে করো না যে, জালিমরা যা করছে সে বিষয়ে আল্লাহ গাফেল। তিনি তো কেবল সেদিন পর্যন্ত তাদের অবকাশ দিচ্ছেন, যেদিন আতঙ্কে চোখগুলো স্থির হয়ে যাবে।
(সূরা ইব্রাহিম: ৪২)

মৃত্যুর দূত কখন এসে দরজায় কড়া নাড়বে, তা আমরা কেউই জানি না। কবরের মাটি দেওয়ার আগেই এবং কানতারার সেই চরম বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে।
পাওনা পরিশোধ: যার হক নষ্ট করেছেন, যার অর্থ মেরেছেন বা ধোঁকাবাজি করেছেন-আজই তার পাওনা বুঝিয়ে দিন।
ওয়ারিশদের অধিকার: মূল ব্যক্তি মারা গেলে বা খুঁজে না পাওয়া গেলে তার পাওনা তার ওয়ারিশদের কাছে পৌঁছে দিন।
সদকা ও ক্ষমা প্রার্থনা: যদি কোনোভাবেই পাওনাদার বা তার ওয়ারিশদের সন্ধান না মেলে, তবে তার নামে সেই অর্থ দান-সদকা করে দিন এবং আল্লাহর কাছে তার মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকুন 
(সহিহ বুখারি: ২৪৪৯)
পরিচয় গোপন রেখে শোধ: সরাসরি ক্ষমা চাইতে লজ্জা বা সামাজিক ভয় থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা অন্য উপায়ে পরিচয় গোপন রেখে পাওনা পরিশোধ করে দিন।
গিবতের ক্ষতিপূরণ: কারো গিবত বা গীবতচর্চা করে থাকলে তার প্রশংসা করার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান  (আল-বাহরুর রায়েক: ৮/৩৯১)।
কেয়ামতের দিন কোটি কোটি মানুষের সামনে জান্নাতের দরজায় ভিখারি হয়ে জাহান্নামে যাওয়ার চেয়ে আজ দুনিয়াতেই একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নত করে পাওনা চুকিয়ে ফেলা সহস্রগুণ সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ।


 __________________________________________________________

MyTv Bhaban, 155, 150/3, Hatirjheel, Dhaka-1219

Phone. ☎ +880255128896 ; Fax. +880255128899

Email. news@mytvbd.tv

web: www.mytvbd,www.mytvbd.com