সরকারি বেতন দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার

আপলোড সময় : ২৮-১০-২০২৬ ১২:৪৩:৩৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-১০-২০২৬ ১২:৪৪:০১ অপরাহ্ন
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবরের বেতন ও আগের তিন মাসের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ নভেম্বর নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের কথা রয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বণিক বার্তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদা মেটাতে সাধারণত ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। তবে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিশেষ বিল ইস্যুর প্রয়োজন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, আগামী রবিবার (১ নভেম্বর) নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হবে। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। নতুন নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে চলতি মাসে মোট ঋণ উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসে এটিই হবে সর্বোচ্চ ঋণ উত্তোলন।

এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

তবে এসব ঋণের বড় অংশ আগের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ কিংবা পুনঃঅর্থায়নে ব্যয় হয়েছে। ফলে নিলামের মাধ্যমে উত্তোলিত ঋণের পরিমাণ এবং সরকারের প্রকৃত বা নিট ঋণের হিসাব এক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। বাকি অর্থের জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ট্রেজারি বিলের সুদহারও বাড়ছে। গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। অথচ আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব।

তিনি জানান, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তী মাসগুলোতেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।

তিনি বলেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে নতুন বেতনকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ানো হলে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়বে। একই সাথে বেসরকারি খাত আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিতে হচ্ছে। এমনকি মেয়াদপূর্তির ঋণ পরিশোধেও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়া পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা।

নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই।
 


 __________________________________________________________

MyTv Bhaban, 155, 150/3, Hatirjheel, Dhaka-1219

Phone. ☎ +880255128896 ; Fax. +880255128899

Email. news@mytvbd.tv

web: www.mytvbd,www.mytvbd.com