ইরানে হামলার ১১তম দিনেও রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা চলছে। মঙ্গলবার যৌথ বাহিনীর হামলায় কেঁপে উঠেছে দেশের বিভিন্ন শহর। হামলা হয়েছে আরও একটি স্কুলসহ বেসামরিক স্থাপনায়। এর পালটা জবাব দিতে ইরানও ইসরাইলসহ আশপাশের মার্কিন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ শেষ করার পরামর্শ দিচ্ছেন দেশ দুটির কর্মকর্তারা। ট্রাম্পও পরিস্থিতি বুঝে এখন যুদ্ধ শেষ করা পথ খুঁজছেন। তবে সহজেই তিনি এ যাত্রায় রেহাই পাবেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, শুরু ট্রাম্প করেছেন; শেষ করব আমরা। খবর রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, এপি, আলজাজিরার।
সোমবার রাতভর যৌথ বাহিনীর বোমাবর্ষণের পর তেহরানে মঙ্গলবারও অনবরত হামলা অব্যাহত রেখেছে আইডিএফ ও মার্কিন বাহিনী। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের কারাতশহর হয়ে পড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। সেখানে যৌথ বাহিনীর হামলার লক্ষ্য ছিল আইআরজিসি, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ড সেন্টার ও কার্যাালয়। ইসফাহানে আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরাজ শহরেও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা করা হয়।
তেহরানে অবস্থানকারী আলজাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি বলেন, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনার কথা শুনেছি এবং ইসফাহান, তাবরিজ, আহভাজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর পেয়েছি।’ এসব হামলায় হতাহতের সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে এ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ইরানে নতুন দফায় হামলা শুরু হয়েছে বলে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ বলেছেন, মঙ্গলবার হবে ইরানে ‘সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন’। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইরান মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়ে যাচ্ছে।’ হেগসেথের দাবি, ২৪ ঘণ্টায় ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের হার ছিল সবচেয়ে কম।
এদিকে ইরান সরকারের বিভিন্ন বার্তায় বলা হচ্ছে, পালটা হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা নেই। পালটা হামলায় ইরান ব্যবহার করছে নতুন নতুন অস্ত্র ও ভারী বিস্ফোরক। ইসরাইল ছাড়াও আইআরজিসির ড্রোন আঘাত হানছে কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও কাতারের মার্কিন সেনাদের অবস্থানে। ইরানের ৩৩তম হামলায় এবার ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়েছে নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র। ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব, বন্দরনগরী হাইফাসহ বেশকিছু স্থানে আঘাত হানে এসব ক্ষেপণাস্ত্র।
কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে হাইব্রিড হামলা চালায় আইআরজিসি। এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আল আবিদি ঘাঁটি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আবারও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হামলায় আবুধাবির একটি শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ড্রোন হামলায় আবুধাবির রুবাইস শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বেশির ভাগই ভূপাতিত করা হয়েছে।
বাহরাইনের একটি হোটেলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হোটেলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হোটেলে ইরানের হামলায় একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, মঙ্গলবার নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫টি ড্রোন শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্যটি সাগরে পড়েছে। আর ৩৫টি ড্রোনের মধ্যে ২৬টি প্রতিহত করেছে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত তাদের কনসুলেট জেনারেল একটি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলায় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পূর্ব তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ হামলায় অন্তত ৪০ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সাত মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে অলাভজনক মানবিক সংস্থা ‘ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’র তথ্য অনুযায়ী, ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানো ১৭৫ জন ছাত্রী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কর্মী রয়েছেন। এছাড়া সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও কয়েক শ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যাবে ইরান এবং যতদিন প্রয়োজন হয়, ততদিন হামলা অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্টের পিবিএস নিউজকে আরাঘচি বলেন, গোলাগুলি অব্যাহত আছে এবং আমাদেরও পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। যতক্ষণ প্রয়োজন হয়, আমরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে শত্রুদের ওপর আঘাত হানতে প্রস্তুত আছি। এতে যতদিন লাগে, লাগুক। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনায় যেতে তেহরান আর আগ্রহী নয় বলেও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, মার্কিনিদের সঙ্গে এর আগেও কয়েকবার আমরা সংলাপে বসেছি। সেসব অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। আমরা আর সেসব অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চাই না। (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) আলোচনা আর আমাদের এজেন্ডার তালিকায় নেই। আরাঘচি দাবি করেন, যে লক্ষ্য নিয়ে ইরানে অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল, তা ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের ৫ হাজারেরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের : ১০ দিনে ইরানের ৫ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) এক বিবৃতিতে এই দাবি করেছে। এতে বলা হয়, ধ্বংস হওয়া এসব সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান রয়েছে। এছাড়াও আছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম), ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানা, সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র এবং সামরিক কমান্ডকেন্দ্র।
ইসরাইলে আহত ২৩৩৯ জন হাসপাতালে : গত ১০ দিনে ইসরাইলে ইরানের নিক্ষিপ্ত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৩৩৯ জন। এই আহতদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯৫ জন এবং তাদের মধ্যে ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৯১ জন।
ইরান থেকে ট্রাম্পকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন উপদেষ্টারা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার দিকে নজর দিচ্ছেন। একই সময়ে কিছু উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে তাকে একটি ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা ‘প্রস্থানপথ’ খুঁজে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে-এ উদ্বেগও রয়েছে। সোমবার ফ্লোরিডায় ট্রাম্প বলেন, সামরিক অভিযানের বেশির ভাগ লক্ষ্য ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এগিয়ে আছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, এই যুদ্ধ ‘খুব শিগগির শেষ হয়ে যাবে’। ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরান যদি আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যেতে থাকে এবং ইসরাইল যদি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে আগ্রহী থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজে এই যুদ্ধ থেকে সরে আসা কঠিন হবে। এদিকে, হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এসংক্রান্ত প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই গল্প অজ্ঞাত সূত্রের ভিত্তিতে বানানো নানা আজেবাজে তথ্য দিয়ে ভরা। আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি, এসব সূত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক কক্ষে উপস্থিত থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ উপদেষ্টারা সপ্তাহের ৭ দিন, দিনে ২৪ ঘণ্টা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সফল রাখতে কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান কবে শেষ হবে, তা নির্ধারণ করবেন সর্বাধিনায়ক।
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে বেশকিছু অসামঞ্জস্যও দেখা গেছে। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ চান এবং সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। কিন্তু সোমবার তিনি নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, এমন কোনো নির্দেশ দেওয়ার কাছাকাছিও তিনি নন। তিনি একদিকে বলেন যুদ্ধ খুব শিগগির শেষ হতে পারে, আবার সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমরা আরও এগোতে পারি এবং আমরা আরও এগোব।’
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ সারা বিশ্বের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ইসরাইলের সিনিয়র কর্মকর্তারাও যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য ‘প্রস্থান পরিকল্পনা’ নিয়ে চিন্তা করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১ লিটার তেলও বের হতে দেবে না ইরান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ইরানই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে চলা ‘যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ’ করবে। মঙ্গলবার ইরান এই ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। আইআরজিসি ট্রাম্পের বক্তব্যকে বিদ্রুপ করে বলেছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কমানোর তার প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। তাদের হুঁশিয়ারি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে শত্রুপক্ষ ও তাদের মিত্রদের কাছে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেবে না। আইআরজিসি বলেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস হয়নি। বরং তারা আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় এবং এক টনেরও বেশি ওজনের ওয়্যারহেডসহ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার থামানোর চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ২০ গুণ কঠোরভাবে হামলা চালাবে। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধটি খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।’
জবাবে আইআরজিসি আরও বলেছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা তারাই নির্ধারণ করবে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত এই বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এখন এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ও সমীকরণ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। আমেরিকান বাহিনী এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না।’ ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফও বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আমরা মনে করি আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।’
খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরও এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ‘অনুতপ্ত’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না। এদিকে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য শর্ত হলো- ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কখনো আক্রমণ করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।
মৃত্যুর গুঞ্জন উড়িয়ে নেতানিয়াহু বললেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন-এমন গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সেই গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। সোমবার রাতে ইসরাইলের ন্যাশনাল হেলথ কমান্ড সেন্টার পরিদর্শনকালে নেতানিয়াহু এই মন্তব্য করেন। তার এই সফরের খবর প্রকাশ হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মৃত্যুর গুঞ্জন অনেকটাই স্তিমিত হয়। সফর শেষে বক্তব্য দেওয়ার একটি ছবিও তার এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়েছে।
লেবাননে হামলায় ইসরাইলি মন্ত্রীর ছেলের কলিজা ছিন্নভিন্ন : লেবানন সীমান্তে এক হামলায় আট ইসরাইলি সেনা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী ও কট্টর ইহুদি জাতীয়তাবাদী নেতা বেজালেল স্মতরিচের ছেলেও। স্মতরিচ জানিয়েছেন, হামলায় তার ছেলের লিভার বা যকৃৎ তথা কলিজা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তবে এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা বা শার্পনেল তার ছেলের ‘পিঠ ও পেটে ঢুকে যায়।’ পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
নিজের প্রতি খেয়াল রাখুন যেন নির্মূল হয়ে না যান : ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ গুণ কঠোর হামলার হুমকি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তেহরান এসব হুমকিকে ভয় পায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লারিজানি লিখেছেন, ‘ইরান আপনার ফাঁকা হুমকিকে ভয় পায় না। আপনার চেয়েও বড়রা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি। নিজের দিকে খেয়াল রাখুন যেন নির্মূল হয়ে না যান!’
সোমবার রাতভর যৌথ বাহিনীর বোমাবর্ষণের পর তেহরানে মঙ্গলবারও অনবরত হামলা অব্যাহত রেখেছে আইডিএফ ও মার্কিন বাহিনী। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের কারাতশহর হয়ে পড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। সেখানে যৌথ বাহিনীর হামলার লক্ষ্য ছিল আইআরজিসি, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ড সেন্টার ও কার্যাালয়। ইসফাহানে আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরাজ শহরেও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা করা হয়।
তেহরানে অবস্থানকারী আলজাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি বলেন, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনার কথা শুনেছি এবং ইসফাহান, তাবরিজ, আহভাজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর পেয়েছি।’ এসব হামলায় হতাহতের সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে এ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ইরানে নতুন দফায় হামলা শুরু হয়েছে বলে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ বলেছেন, মঙ্গলবার হবে ইরানে ‘সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন’। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইরান মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়ে যাচ্ছে।’ হেগসেথের দাবি, ২৪ ঘণ্টায় ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের হার ছিল সবচেয়ে কম।
এদিকে ইরান সরকারের বিভিন্ন বার্তায় বলা হচ্ছে, পালটা হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা নেই। পালটা হামলায় ইরান ব্যবহার করছে নতুন নতুন অস্ত্র ও ভারী বিস্ফোরক। ইসরাইল ছাড়াও আইআরজিসির ড্রোন আঘাত হানছে কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও কাতারের মার্কিন সেনাদের অবস্থানে। ইরানের ৩৩তম হামলায় এবার ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়েছে নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র। ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব, বন্দরনগরী হাইফাসহ বেশকিছু স্থানে আঘাত হানে এসব ক্ষেপণাস্ত্র।
কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে হাইব্রিড হামলা চালায় আইআরজিসি। এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আল আবিদি ঘাঁটি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আবারও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হামলায় আবুধাবির একটি শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ড্রোন হামলায় আবুধাবির রুবাইস শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বেশির ভাগই ভূপাতিত করা হয়েছে।
বাহরাইনের একটি হোটেলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হোটেলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হোটেলে ইরানের হামলায় একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, মঙ্গলবার নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫টি ড্রোন শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্যটি সাগরে পড়েছে। আর ৩৫টি ড্রোনের মধ্যে ২৬টি প্রতিহত করেছে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত তাদের কনসুলেট জেনারেল একটি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলায় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পূর্ব তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ হামলায় অন্তত ৪০ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সাত মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে অলাভজনক মানবিক সংস্থা ‘ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’র তথ্য অনুযায়ী, ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানো ১৭৫ জন ছাত্রী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কর্মী রয়েছেন। এছাড়া সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও কয়েক শ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যাবে ইরান এবং যতদিন প্রয়োজন হয়, ততদিন হামলা অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্টের পিবিএস নিউজকে আরাঘচি বলেন, গোলাগুলি অব্যাহত আছে এবং আমাদেরও পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। যতক্ষণ প্রয়োজন হয়, আমরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে শত্রুদের ওপর আঘাত হানতে প্রস্তুত আছি। এতে যতদিন লাগে, লাগুক। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনায় যেতে তেহরান আর আগ্রহী নয় বলেও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, মার্কিনিদের সঙ্গে এর আগেও কয়েকবার আমরা সংলাপে বসেছি। সেসব অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। আমরা আর সেসব অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চাই না। (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) আলোচনা আর আমাদের এজেন্ডার তালিকায় নেই। আরাঘচি দাবি করেন, যে লক্ষ্য নিয়ে ইরানে অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল, তা ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের ৫ হাজারেরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের : ১০ দিনে ইরানের ৫ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) এক বিবৃতিতে এই দাবি করেছে। এতে বলা হয়, ধ্বংস হওয়া এসব সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান রয়েছে। এছাড়াও আছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম), ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানা, সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র এবং সামরিক কমান্ডকেন্দ্র।
ইসরাইলে আহত ২৩৩৯ জন হাসপাতালে : গত ১০ দিনে ইসরাইলে ইরানের নিক্ষিপ্ত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৩৩৯ জন। এই আহতদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯৫ জন এবং তাদের মধ্যে ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৯১ জন।
ইরান থেকে ট্রাম্পকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন উপদেষ্টারা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার দিকে নজর দিচ্ছেন। একই সময়ে কিছু উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে তাকে একটি ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা ‘প্রস্থানপথ’ খুঁজে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে-এ উদ্বেগও রয়েছে। সোমবার ফ্লোরিডায় ট্রাম্প বলেন, সামরিক অভিযানের বেশির ভাগ লক্ষ্য ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এগিয়ে আছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, এই যুদ্ধ ‘খুব শিগগির শেষ হয়ে যাবে’। ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরান যদি আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যেতে থাকে এবং ইসরাইল যদি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে আগ্রহী থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজে এই যুদ্ধ থেকে সরে আসা কঠিন হবে। এদিকে, হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এসংক্রান্ত প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই গল্প অজ্ঞাত সূত্রের ভিত্তিতে বানানো নানা আজেবাজে তথ্য দিয়ে ভরা। আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি, এসব সূত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক কক্ষে উপস্থিত থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ উপদেষ্টারা সপ্তাহের ৭ দিন, দিনে ২৪ ঘণ্টা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সফল রাখতে কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান কবে শেষ হবে, তা নির্ধারণ করবেন সর্বাধিনায়ক।
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে বেশকিছু অসামঞ্জস্যও দেখা গেছে। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ চান এবং সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। কিন্তু সোমবার তিনি নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, এমন কোনো নির্দেশ দেওয়ার কাছাকাছিও তিনি নন। তিনি একদিকে বলেন যুদ্ধ খুব শিগগির শেষ হতে পারে, আবার সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমরা আরও এগোতে পারি এবং আমরা আরও এগোব।’
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ সারা বিশ্বের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ইসরাইলের সিনিয়র কর্মকর্তারাও যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য ‘প্রস্থান পরিকল্পনা’ নিয়ে চিন্তা করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১ লিটার তেলও বের হতে দেবে না ইরান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ইরানই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে চলা ‘যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ’ করবে। মঙ্গলবার ইরান এই ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। আইআরজিসি ট্রাম্পের বক্তব্যকে বিদ্রুপ করে বলেছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কমানোর তার প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। তাদের হুঁশিয়ারি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে শত্রুপক্ষ ও তাদের মিত্রদের কাছে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেবে না। আইআরজিসি বলেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস হয়নি। বরং তারা আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় এবং এক টনেরও বেশি ওজনের ওয়্যারহেডসহ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার থামানোর চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ২০ গুণ কঠোরভাবে হামলা চালাবে। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধটি খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।’
জবাবে আইআরজিসি আরও বলেছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা তারাই নির্ধারণ করবে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত এই বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এখন এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ও সমীকরণ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। আমেরিকান বাহিনী এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না।’ ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফও বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আমরা মনে করি আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।’
খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরও এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ‘অনুতপ্ত’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না। এদিকে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য শর্ত হলো- ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কখনো আক্রমণ করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।
মৃত্যুর গুঞ্জন উড়িয়ে নেতানিয়াহু বললেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন-এমন গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সেই গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। সোমবার রাতে ইসরাইলের ন্যাশনাল হেলথ কমান্ড সেন্টার পরিদর্শনকালে নেতানিয়াহু এই মন্তব্য করেন। তার এই সফরের খবর প্রকাশ হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মৃত্যুর গুঞ্জন অনেকটাই স্তিমিত হয়। সফর শেষে বক্তব্য দেওয়ার একটি ছবিও তার এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়েছে।
লেবাননে হামলায় ইসরাইলি মন্ত্রীর ছেলের কলিজা ছিন্নভিন্ন : লেবানন সীমান্তে এক হামলায় আট ইসরাইলি সেনা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী ও কট্টর ইহুদি জাতীয়তাবাদী নেতা বেজালেল স্মতরিচের ছেলেও। স্মতরিচ জানিয়েছেন, হামলায় তার ছেলের লিভার বা যকৃৎ তথা কলিজা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তবে এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা বা শার্পনেল তার ছেলের ‘পিঠ ও পেটে ঢুকে যায়।’ পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
নিজের প্রতি খেয়াল রাখুন যেন নির্মূল হয়ে না যান : ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ গুণ কঠোর হামলার হুমকি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তেহরান এসব হুমকিকে ভয় পায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লারিজানি লিখেছেন, ‘ইরান আপনার ফাঁকা হুমকিকে ভয় পায় না। আপনার চেয়েও বড়রা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি। নিজের দিকে খেয়াল রাখুন যেন নির্মূল হয়ে না যান!’