‘হিমালয় কন্যা’ খ্যাত দেশটিতে অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন দল রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টি (আরএসপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। মাত্র তিন বছর আগে দলটির যাত্রা শুরু করেছে।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নেপালের আরএসপির এই জয়কে ‘টসুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এটি শুধুমাত্র একটি নির্বাচনের ফল নয়, বরং একটি প্রজন্মের দীর্ঘ নিরাশা ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচক হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্বে যত জেন-জি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, কেউ না পারলেও নেপালের জেন-জি কিন্তু তাদের বিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে সমর্থ হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া নেপালের ছাত্র-যুব আন্দোলনই এই পরিবর্তনের পটভূমি গড়ে তুলেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, উচ্চ বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল তখন সমগ্র নেপালে। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে প্রায় শতাধিক সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে। এর ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
দায়িত্ব নিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সুশীলা কার্কি। দীর্ঘ দুই দশকের পুনরাবৃত্তিকে ভেঙে দেওয়া এই আন্দোলন ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। জনগণের একাংশ মনে করছে, পুরোনো দলগুলো শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখছে। সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে উপেক্ষা করছে। নেপালের সাধারণ জনগণ এখন জবাবদিহি, স্বচ্ছ ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির দাবি করছে।
পুরোনো শক্তির পতন ও ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ মনোভাব
নেপালের রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল ও প্রজাতন্ত্রীবাদী (মাওবাদী) দলগুলো। এই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ভরাডুবি হয়েছে এসব সুপ্রতিষ্ঠিত দলগুলোর। নেপাল কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে জয়ী হয়েছে এবং চারবারের প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন সিপিএন-ইউএমএলও ব্যর্থ হয়েছে।
মূলত নেপালের ঐতিহ্যবাহী দলগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তারা চরম ফলাফল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে। আবার বালেন শাহের আরএসপি এমন এক শূন্যস্থান তৈরি করেছে যে, নেপাল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ৩০০ সদস্যের আইনসভায় প্রথম ধাপে ১৩৭টি আসনে আরএসপি ১০০টি আসনে এগিয়ে ছিল।
যা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাহিরের ঘটনা। এই ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ভোট’ মূলত পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন। এটি নির্দেশ প্রদান করে যে, নেপালের সাধারণত মানুষ এখন পুরোনো দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের দেখে দেখে ক্লান্ত। তারা এখন বলেন্দ্র শাহের মতো নতুন, তরুণ, জেন-জি নেতার প্রতি বেশ আস্থাশীল।
এবারের নির্বাচনে বলেন্দ্রের দল আরএসপি প্রচার চালিয়েছিল যে ‘দুর্নীতিহীন সমাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান’। তারা পুরোনো ঘড়ির কাঁটায় আটকে থাকা রাজনীতির পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন। দক্ষ প্রশাসন ও সৎ কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
র্যাপার থেকে জেন-জি আন্দোলন শ্লোগানে মিথস্ক্রিয়া করে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদ বলেন্দ্র শাহ’র নাম। ২০২২ সালে কাঠমান্ডু মহানগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন এই ভ্যালির পরিচিত একজন র্যাপ তারকা।
এর প্রভাবে গ্রাম-শহরের তরুণ ভোটাররা পুরোনো দলগুলোর প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ার বদলে নতুন দলের দিকে ঝুঁকেছে। ফলাফলে দেখা গেছে অনেক জায়গায় ভোটাররা এমন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন যাকে তারা আগে চিনতেনও না। একেবারে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোতে তারা আশার ছায়া খুঁজে পেতে চেয়েছেন।
র্যাপার থেকে জেন-জি আন্দোলন শ্লোগানে মিথস্ক্রিয়া করে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদ বলেন্দ্র শাহ’র নাম। ২০২২ সালে কাঠমান্ডু মহানগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন এই ভ্যালির পরিচিত একজন র্যাপ তারকা। আন্দোলনের সময় এই বলেন্দ্র শাহ বা বালেনকে ‘নতুন প্রজন্মের প্রতীক’ মনে করে নেপালের তরুণ সমাজ তার চারপাশে জমায়েত হয়েছিল।
আমেরিকান থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফোরেন রিলেশন (CFR)-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, তিনি এমন এক নতুন মুখ ছিলেন যে দেশের ঘাঁটি কঠিন প্রথা এবং পুরোনো সমস্যা থেকে মুক্ত করতে তিনি আলোকবর্তিকা রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই তো বালেন শাহ ঝাপা-৫ আসনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওলির বিরুদ্ধে মনোনয়ন নিয়েছেন। ওলিকে চরমভাবে হারিয়েছেন তিনি।
ঝাপা-৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে ওলির ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। ৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহ হিমালয়ের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথে প্রথম বেন্ডিয়ান (মধেসি) প্রতিনিধি হয়ে শাসনভার গ্রহণের পথে রয়েছেন। জেন-জি প্রজন্মগত প্রতীক হিসেবে তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে আস্থা অর্জন করেছেন। ঐ থিংক ট্যাঙ্ক নিবন্ধ আরও উল্লেখ করেছে, ‘প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন ভোটার বালেনের দলকে ভোট দিয়েছে। অন্যথায় এই সুনামি সম্ভব হতো না।’
নেপালের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বিদেশি মেরুকরণও বেশ ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দুই প্রতিবেশী পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে নেপালের ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি তাদের সংসদীয় সংবিধানের মাধ্যমেও নিশ্চিত করা আছে। তাদের সংবিধান আর্টিকেল ৫১-তে বলা আছে, দেশের বৈদেশিক নীতি হবে ‘নিরপেক্ষতা’ তথা পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
অতীতে ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেপাল পরিমিত ধাপে এগিয়েছে। যদিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির শাসনকালে চীনপন্থি উদ্যোগ যেমন বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাড়ে। তেমনি দেশটিতে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করছে দেশের একাংশ।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানির মতে, ‘নেপালের মূল দুই জনতান্ত্রিক দলের পরাজয় চীনের প্রতিবেশী কৌশলের জন্য বড় ধাক্কা।’অর্থাৎ চীন দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে। এই রাজনৈতিক উত্থান ভারতের জন্য একটি সুযোগ সাধনের গর্ভও বহন করতে পারে। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় নয়।ভারত ও নেপাল ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের মধ্যে আবদ্ধ। ‘রুটি-বেটি’ সংজ্ঞা অনুযায়ী দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যে বলেন্দ্র শাহ এবং আরএসপি চেয়ারম্যান রবি লামিছহানেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দুই দেশের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন।
সদ্য বিজয়ী দল RSP ও আশা করেছেন, তারা ‘উন্নয়ন কূটনীতি’র মাধ্যমে ভারতসহ প্রতিবেশী সব দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখবে। তাদের মাথায় এটিও আছে নেপাল কিন্তু একটা ল্যান্ড লক বা সীমানাবেষ্টিত দেশ। কূটনৈতিক কৌশল কোনরকম ব্যর্থ হলে যেকোনো সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
নেপালের নির্বাচনের ফলাফল যদিও প্রথম ঝলকে নাটকীয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন নবগঠিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২৭৫টি আসনের সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এতো সহজ বিষয় নয়।নেপালে কিন্তু পিআর (Proportional Representation ) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু। অতীতে অনেক সরকার আনুপাতিক সংখ্যার অনাস্থার কারণে সরকার পতন হয়েছে। তাই জোট রাজনীতির রণনীতি ভালোভাবে বুঝতে হবে।একটা বিষয় নিশ্চিত তা হলো, নেপাল যেন তার পুরোনো গ্রন্থে নতুন একটি অধ্যায় লিখতে চলছে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহু তরুণ-তরুণীরা। যারা কিনা পুরোনো রাজনীতির শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।বিভক্তি আনা যাবে না। রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে। জনগণের চাহিদাকে মূল্য দিতে হবে। বালেনে শাহের আরএসপি এখন বৃহত্তম দল। তাদের সামনে চাহিদার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ ও রয়েছে। প্রথমটি হলো যুবসমাজের প্রত্যাশা পূরণ করা। অন্যটি হলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনৈতিক ক্রমপতন ঠেকিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
যদিও নতুন সরকারকে পুরোনো সমস্যা যেমন দুর্নীতি, অসমতা, কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। যা মোটেও সহজ কাজ না। জনগণ যেহেতু বিপুল ভোটে বালেন শাহের দলকে জয়যুক্ত করেছে। সেহেতু তারা অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের নতুন নেতৃত্বকে পরখ করতে সময় দেবে।এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখে নতুন সরকারকে কার্যকরী করতে হবে। এটা ঠিক নেপালের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন রাজনীতিতে পুরোনো সংস্কৃতি ভেঙে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসবে সুনিশ্চিত।এই জয় বলেন্দ্র শাহের এবং তার রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টির জন্য নিঃসন্দেহে এক নতুন ভিন্ন বার্তা। এটি প্রাচীন কাঠামোতে এক দলের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ বটে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই জেন-জি সুনামি কি পুষ্পিত স্থিতি এনে দেবে নাকি সাময়িক উত্তেজনা বাড়াবে? নাকি সময়ের সাথে সাথে তারা লক্ষ্য ও নীতি থেকে দূরে চলে যাবে? একইভাবে, নেপালের বহুজাতিক ভারসাম্য নীতি কি ভেঙে পড়বে নাকি নতুন রূপে আসবে? সেটিও হয়তো ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নেপালের আরএসপির এই জয়কে ‘টসুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এটি শুধুমাত্র একটি নির্বাচনের ফল নয়, বরং একটি প্রজন্মের দীর্ঘ নিরাশা ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচক হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্বে যত জেন-জি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, কেউ না পারলেও নেপালের জেন-জি কিন্তু তাদের বিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে সমর্থ হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া নেপালের ছাত্র-যুব আন্দোলনই এই পরিবর্তনের পটভূমি গড়ে তুলেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, উচ্চ বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল তখন সমগ্র নেপালে। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে প্রায় শতাধিক সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে। এর ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
দায়িত্ব নিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সুশীলা কার্কি। দীর্ঘ দুই দশকের পুনরাবৃত্তিকে ভেঙে দেওয়া এই আন্দোলন ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। জনগণের একাংশ মনে করছে, পুরোনো দলগুলো শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখছে। সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে উপেক্ষা করছে। নেপালের সাধারণ জনগণ এখন জবাবদিহি, স্বচ্ছ ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির দাবি করছে।
পুরোনো শক্তির পতন ও ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ মনোভাব
নেপালের রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল ও প্রজাতন্ত্রীবাদী (মাওবাদী) দলগুলো। এই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ভরাডুবি হয়েছে এসব সুপ্রতিষ্ঠিত দলগুলোর। নেপাল কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে জয়ী হয়েছে এবং চারবারের প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন সিপিএন-ইউএমএলও ব্যর্থ হয়েছে।
মূলত নেপালের ঐতিহ্যবাহী দলগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তারা চরম ফলাফল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে। আবার বালেন শাহের আরএসপি এমন এক শূন্যস্থান তৈরি করেছে যে, নেপাল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ৩০০ সদস্যের আইনসভায় প্রথম ধাপে ১৩৭টি আসনে আরএসপি ১০০টি আসনে এগিয়ে ছিল।
যা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাহিরের ঘটনা। এই ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ভোট’ মূলত পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন। এটি নির্দেশ প্রদান করে যে, নেপালের সাধারণত মানুষ এখন পুরোনো দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের দেখে দেখে ক্লান্ত। তারা এখন বলেন্দ্র শাহের মতো নতুন, তরুণ, জেন-জি নেতার প্রতি বেশ আস্থাশীল।
এবারের নির্বাচনে বলেন্দ্রের দল আরএসপি প্রচার চালিয়েছিল যে ‘দুর্নীতিহীন সমাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান’। তারা পুরোনো ঘড়ির কাঁটায় আটকে থাকা রাজনীতির পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন। দক্ষ প্রশাসন ও সৎ কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
র্যাপার থেকে জেন-জি আন্দোলন শ্লোগানে মিথস্ক্রিয়া করে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদ বলেন্দ্র শাহ’র নাম। ২০২২ সালে কাঠমান্ডু মহানগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন এই ভ্যালির পরিচিত একজন র্যাপ তারকা।
এর প্রভাবে গ্রাম-শহরের তরুণ ভোটাররা পুরোনো দলগুলোর প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ার বদলে নতুন দলের দিকে ঝুঁকেছে। ফলাফলে দেখা গেছে অনেক জায়গায় ভোটাররা এমন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন যাকে তারা আগে চিনতেনও না। একেবারে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোতে তারা আশার ছায়া খুঁজে পেতে চেয়েছেন।
র্যাপার থেকে জেন-জি আন্দোলন শ্লোগানে মিথস্ক্রিয়া করে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদ বলেন্দ্র শাহ’র নাম। ২০২২ সালে কাঠমান্ডু মহানগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন এই ভ্যালির পরিচিত একজন র্যাপ তারকা। আন্দোলনের সময় এই বলেন্দ্র শাহ বা বালেনকে ‘নতুন প্রজন্মের প্রতীক’ মনে করে নেপালের তরুণ সমাজ তার চারপাশে জমায়েত হয়েছিল।
আমেরিকান থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফোরেন রিলেশন (CFR)-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, তিনি এমন এক নতুন মুখ ছিলেন যে দেশের ঘাঁটি কঠিন প্রথা এবং পুরোনো সমস্যা থেকে মুক্ত করতে তিনি আলোকবর্তিকা রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই তো বালেন শাহ ঝাপা-৫ আসনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওলির বিরুদ্ধে মনোনয়ন নিয়েছেন। ওলিকে চরমভাবে হারিয়েছেন তিনি।
ঝাপা-৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে ওলির ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। ৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহ হিমালয়ের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথে প্রথম বেন্ডিয়ান (মধেসি) প্রতিনিধি হয়ে শাসনভার গ্রহণের পথে রয়েছেন। জেন-জি প্রজন্মগত প্রতীক হিসেবে তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে আস্থা অর্জন করেছেন। ঐ থিংক ট্যাঙ্ক নিবন্ধ আরও উল্লেখ করেছে, ‘প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন ভোটার বালেনের দলকে ভোট দিয়েছে। অন্যথায় এই সুনামি সম্ভব হতো না।’
নেপালের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বিদেশি মেরুকরণও বেশ ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দুই প্রতিবেশী পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে নেপালের ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি তাদের সংসদীয় সংবিধানের মাধ্যমেও নিশ্চিত করা আছে। তাদের সংবিধান আর্টিকেল ৫১-তে বলা আছে, দেশের বৈদেশিক নীতি হবে ‘নিরপেক্ষতা’ তথা পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
অতীতে ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেপাল পরিমিত ধাপে এগিয়েছে। যদিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির শাসনকালে চীনপন্থি উদ্যোগ যেমন বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাড়ে। তেমনি দেশটিতে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করছে দেশের একাংশ।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানির মতে, ‘নেপালের মূল দুই জনতান্ত্রিক দলের পরাজয় চীনের প্রতিবেশী কৌশলের জন্য বড় ধাক্কা।’অর্থাৎ চীন দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে। এই রাজনৈতিক উত্থান ভারতের জন্য একটি সুযোগ সাধনের গর্ভও বহন করতে পারে। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় নয়।ভারত ও নেপাল ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের মধ্যে আবদ্ধ। ‘রুটি-বেটি’ সংজ্ঞা অনুযায়ী দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যে বলেন্দ্র শাহ এবং আরএসপি চেয়ারম্যান রবি লামিছহানেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দুই দেশের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন।
সদ্য বিজয়ী দল RSP ও আশা করেছেন, তারা ‘উন্নয়ন কূটনীতি’র মাধ্যমে ভারতসহ প্রতিবেশী সব দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখবে। তাদের মাথায় এটিও আছে নেপাল কিন্তু একটা ল্যান্ড লক বা সীমানাবেষ্টিত দেশ। কূটনৈতিক কৌশল কোনরকম ব্যর্থ হলে যেকোনো সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
নেপালের নির্বাচনের ফলাফল যদিও প্রথম ঝলকে নাটকীয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন নবগঠিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২৭৫টি আসনের সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এতো সহজ বিষয় নয়।নেপালে কিন্তু পিআর (Proportional Representation ) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু। অতীতে অনেক সরকার আনুপাতিক সংখ্যার অনাস্থার কারণে সরকার পতন হয়েছে। তাই জোট রাজনীতির রণনীতি ভালোভাবে বুঝতে হবে।একটা বিষয় নিশ্চিত তা হলো, নেপাল যেন তার পুরোনো গ্রন্থে নতুন একটি অধ্যায় লিখতে চলছে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহু তরুণ-তরুণীরা। যারা কিনা পুরোনো রাজনীতির শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।বিভক্তি আনা যাবে না। রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে। জনগণের চাহিদাকে মূল্য দিতে হবে। বালেনে শাহের আরএসপি এখন বৃহত্তম দল। তাদের সামনে চাহিদার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ ও রয়েছে। প্রথমটি হলো যুবসমাজের প্রত্যাশা পূরণ করা। অন্যটি হলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনৈতিক ক্রমপতন ঠেকিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
যদিও নতুন সরকারকে পুরোনো সমস্যা যেমন দুর্নীতি, অসমতা, কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। যা মোটেও সহজ কাজ না। জনগণ যেহেতু বিপুল ভোটে বালেন শাহের দলকে জয়যুক্ত করেছে। সেহেতু তারা অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের নতুন নেতৃত্বকে পরখ করতে সময় দেবে।এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখে নতুন সরকারকে কার্যকরী করতে হবে। এটা ঠিক নেপালের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন রাজনীতিতে পুরোনো সংস্কৃতি ভেঙে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসবে সুনিশ্চিত।এই জয় বলেন্দ্র শাহের এবং তার রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টির জন্য নিঃসন্দেহে এক নতুন ভিন্ন বার্তা। এটি প্রাচীন কাঠামোতে এক দলের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ বটে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই জেন-জি সুনামি কি পুষ্পিত স্থিতি এনে দেবে নাকি সাময়িক উত্তেজনা বাড়াবে? নাকি সময়ের সাথে সাথে তারা লক্ষ্য ও নীতি থেকে দূরে চলে যাবে? একইভাবে, নেপালের বহুজাতিক ভারসাম্য নীতি কি ভেঙে পড়বে নাকি নতুন রূপে আসবে? সেটিও হয়তো ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে।